‘নানা, আমি ১৫ মিনিটের মধ্যে আসতেছি’ বলা নাবিল এলেন লাশ হয়ে

0
‘নানা, আমি ১৫ মিনিটের মধ্যে আসতেছি’ বলা নাবিল এলেন লাশ হয়ে

‘নানা, আমি আর ১৫ মিনিটের মধ্যে খোকসা বাসস্ট্যান্ডে চলে আসতেছি’—মোবাইল ফোনে নানাকে বলা এটাই ছিল নাতি নাবিলের শেষ কথা। এর ঠিক এক ঘণ্টা পর নানা পিয়ার আলী যখন বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছান, ততক্ষণে সব শেষ। অতি আদরের নাতি এসেছে, তবে হেঁটে নয়, লাশ হয়ে। 

হাসপাতালের করিডরে নাতির নিথর দেহের সামনে দাঁড়িয়ে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন বৃদ্ধ পিয়ার আলী। তার কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছিল হাসপাতালের বাতাস। 

​শনিবার (২৩ মে) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার শিমুলিয়া ইউনিয়নের কুটিপাড়া এলাকার আঞ্চলিক মহাসড়কে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা কেড়ে নিয়েছে ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজের অর্থনীতি বিভাগের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী নাবিলসহ চারজনের প্রাণ। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও অন্তত ২০-২৫ জন।

​পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ফরিদপুর সদর উপজেলার মুন্সীবাজার এলাকার জুনায়েদের ছেলে নাবিল। বাবা ছোটখাটো ব্যবসা করেন। মা অনেক কষ্ট করে ছেলেকে রাজেন্দ্র কলেজে ভর্তি করিয়েছিলেন। মায়ের স্বপ্ন ছিল- ছেলে পড়াশোনা শেষ করে বড় চাকরি করবে, সংসারের হাল ধরবে। কিন্তু একটি বেপরোয়া ডাম্পট্রাকের ধাক্কা মুহূর্তে ওলটপালট করে দিল সব স্বপ্ন।

​নিহত নাবিলের নানা পিয়ার আলী আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, ‌‘ওদের এবার কোরবানি ছিল না। তাই আমি বললাম, তুমি এখানে চলে আসো। ও ঈদ করতে আমার বাড়িতে আসছিল। আমি ওকে শুক্রবার আসতে বলেছিলাম, কিন্তু ও বলল জামাকাপড় কিনে শনিবার আসবে। সকাল সাড়ে ৮টায় ফোন করলাম, বলল রওনা হয়েছে। সাড়ে ৯টায় বলল আর ১৫ মিনিট লাগবে। সাড়ে ১০টার পর থেকে ফোন বন্ধ। ভেবেছিলাম চার্জ নেই, কিন্তু মন মানছিল না। বাসস্ট্যান্ডে এসে শুনি গাড়ি অ্যাক্সিডেন্ট করেছে। হাসপাতালে এসে দেখি ও মরে পড়ে আছে।’ বলেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। 

প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ জানায়, রাজবাড়ী থেকে কুষ্টিয়াগামী আনুমানিক ৫০ জন যাত্রীবোঝাই একটি যাত্রীবাহী বাসকে কুষ্টিয়ার কুমারখালী জিলাপিতলা এলাকা থেকে আসা একটি দ্রুতগামী ডাম্পট্রাক সজোরে ধাক্কা দেয়। ধাক্কার তীব্রতায় বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের পাশের একটি পুকুরে উল্টে পড়ে যায়।

​খবর পেয়ে স্থানীয় জনতা ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা দ্রুত উদ্ধার অভিযান শুরু করেন। বাস থেকে যাত্রীদের উদ্ধার করে খোকসা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক নাবিলসহ দুজনকে মৃত ঘোষণা করেন। নিহত অন্যজনের বয়স আনুমানিক ৬০ বছর, যার পরিচয় এখনো জানা যায়নি।

​পরবর্তীতে কুষ্টিয়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও দুজনের মৃত্যু হয়। তাদের মধ্যে একজন কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার ফিলিপনগর এলাকার রফিয়া (১৭) এবং অন্যজন আনুমানিক ৫০ বছর বয়সী এক অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি। এ নিয়ে দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪ জনে।

খোকসা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) জানান, আহতদের মধ্যে ১১ জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে, যার মধ্যে দুজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। বাকিরা খোকসায় চিকিৎসাধীন আছেন।

কুষ্টিয়া হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু ওবায়েদ জানান, বিপরীত দিক থেকে আসা ড্রাম্পট্রাকের ধাক্কাতেই বাসটি ডোবায় উল্টে যায়।

​খোকসা সহকারী কমিশনার (ভূমি) জানিয়েছেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে আহতদের দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সব ধরনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং দুর্ঘটনার সঠিক কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত চলছে।

​একটি দুর্ঘটনা শুধু চারজন মানুষের প্রাণই কেড়ে নেয়নি, নাবিলের মতো একবুক স্বপ্ন নিয়ে বাঁচা একঝাঁক তরুণের ভবিষ্যৎ এবং তাদের পরিবারের আশার প্রদীপ চিরতরে নিভিয়ে দিল। নানাবাড়ির আনন্দের ঈদ এখন রূপ নিয়েছে শোক আর বিষাদে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here