ককরোচ জনতা পার্টি, ভারতে নতুন রাজনৈতিক ঝড়

0
ককরোচ জনতা পার্টি, ভারতে নতুন রাজনৈতিক ঝড়

ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের বিতর্কিত মন্তব্যকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে এক নজিরবিহীন ব্যঙ্গাত্মক প্রতিবাদ ও রাজনৈতিক আন্দোলন। ‘ককোরোচ জনতা পার্টি’ নামের এই অনলাইনভিত্তিক আন্দোলনে ইতিমধ্যেই লাখ লাখ তরুণ যুক্ত হয়েছেন। এই তরুণদের সিংহভাগই জেন-জি প্রজন্মের। বোস্টন ইউনিভার্সিটির পাবলিক রিলেশন্সের স্নাতক ৩০ বছর বয়সী অভিজিৎ দিপকের একটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের রসিকতা এখন এক বিশাল গণআন্দোলনের রূপ নিয়েছে।

সম্প্রতি একটি মামলার শুনানির সময় প্রধান বিচারপতি মন্তব্য করেন, কিছু বেকার তরুণ তেলাপোকার মতো, যারা কোনো চাকরি না পেয়ে সমাজ ও ব্যবস্থার ওপর আক্রমণ চালাচ্ছে। তারা গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কিংবা তথ্যের অধিকার কর্মী সেজে সবাইকে হেনস্তা করছে। যদিও পরবর্তীতে তিনি ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন যে তার মন্তব্যটি ছিল ভুয়া ডিগ্রিধারীদের বিরুদ্ধে এবং তিনি ভারতের তরুণদের দেশের স্তম্ভ মনে করেন, ততক্ষণে ক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে পড়ে। দীর্ঘদিন ধরে চলমান বেকারত্ব, মুদ্রাস্ফীতি এবং ধর্মীয় মেরুকরণে বিপর্যস্ত ভারতের যুবসমাজ এই মন্তব্যকে তাদের প্রতি চরম অবমাননা হিসেবে গ্রহণ করে।

এই ক্ষোভকে পুঁজি করেই অভিজিৎ দিপক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রশ্ন তোলেন, সব তেলাপোকা যদি এক হয়ে যায় তবে কেমন হবে? এরপরই তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ‘ভারতীয় জনতা পার্টি’র নামের সাথে মিল রেখে রসাত্মকভাবে ‘ককোরোচ জনতা পার্টি’ গঠন করেন এবং একটি ওয়েবসাইট চালু করেন। মাত্র তিন দিনে দলটির ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে অনুসারীর সংখ্যা ৩০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে এবং সাড়ে তিন লাখেরও বেশি মানুষ এর সদস্য পদের জন্য আবেদন করেছেন। মজার বিষয় হলো, এই ব্যঙ্গাত্মক দলে শুধু সাধারণ তরুণরাই নন, নাম লিখিয়েছেন মহুয়া মৈত্রের মতো প্রভাবশালী বিরোধী সংসদ সদস্য এবং অবসরপ্রাপ্ত আমলারাও।

প্রবীণ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা বলছেন, ভারতের বর্তমান ভয়ের পরিবেশ এবং ভিন্নমতাবলম্বীদের দমনের প্রেক্ষাপটে এই আন্দোলনটি মুক্ত বাতাসের মতো এসেছে। তেলাপোকা যেমন চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও টিকে থাকতে পারে, তেমনই দেশের তরুণরাও এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে টিকে থাকার লড়াই শুরু করেছে। ভারতের বর্তমান প্রেক্ষাপটে যখন মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের মতো ঘটনা নিয়ে দেশজুড়ে ছাত্র আন্দোলন চলছে, ঠিক তখনই প্রধান বিচারপতির এমন মন্তব্য যুবসমাজের ক্ষোভকে আরও উস্কে দিয়েছে। বিশিষ্ট আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী প্রশান্ত ভূষণ একে সুপ্রিম কোর্ট ও সরকারের একটি গভীর কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানসিকতার প্রতিফলন বলে উল্লেখ করেছেন।

এই দলটির মূল লক্ষ্য ও যোগ্যতাও নির্ধারণ করা হয়েছে অত্যন্ত রসাত্মকভাবে, যার মধ্যে রয়েছে বেকারত্ব, অলসতা এবং ইন্টারনেটে নিয়মিত ক্ষোভ প্রকাশ করা। দলটির ইশতেহারে ভারতের বর্তমান নির্বাচনী ব্যবস্থার অসঙ্গতি, কর্পোরেট মিডিয়া এবং বিচারকদের অবসরের পর সরকারি পদ পাওয়ার প্রবণতাকে উপহাস করা হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মানুষ বাস্তব রাজনীতির ওপর কতটা হতাশ হলে এমন একটি কাল্পনিক ও ব্যঙ্গাত্মক দলকে নিজেদের বিকল্প হিসেবে বেছে নেয়, এটি তারই প্রমাণ। একটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কৌতুক দিয়ে শুরু হলেও তরুণদের এই পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এখন এক বিশাল রাজনৈতিক পরীক্ষার রূপ নিয়েছে, যা অবহেলা করার মতো নয়।

সূত্র: আল জাজিরা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here