ইরাকে ইসরায়েলের গোপন সামরিক ঘাঁটি নিয়ে যা জানা গেল: আল-জাজিরা

0
ইরাকে ইসরায়েলের গোপন সামরিক ঘাঁটি নিয়ে যা জানা গেল: আল-জাজিরা

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরুর আগে ইরাকের মরুভূমিতে গোপনে একটি সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করেছিল ইসরায়েল- মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে এমনটি দাবি করা হয়েছে। ওই ঘাঁটি থেকে বিশেষ বাহিনী পরিচালনা, বিমান অভিযানে সহায়তা এবং ভূপাতিত পাইলটদের উদ্ধারের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বিষয়টি নিয়ে ইরাকের ভেতরে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেখা দিয়েছে ব্যাপক বিতর্ক ও বিভ্রান্তি।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল শনিবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানায়, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার ঠিক আগে যুক্তরাষ্ট্রের জ্ঞাতসারে ইসরায়েল ইরাকের মরুভূমিতে একটি গোপন সামরিক স্থাপনা গড়ে তোলে। ওই ঘাঁটিতে ইসরায়েলি বিশেষ বাহিনীর সদস্যরা অবস্থান করতেন এবং এটি বিমানবাহিনীর জন্য লজিস্টিক কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ঘাঁটিটিতে অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দলও প্রস্তুত রাখা হয়েছিল, যাতে অভিযানের সময় কোনও ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হলে পাইলটদের দ্রুত উদ্ধার করা যায়।

সংবাদমাধ্যমটির দাবি, মার্চের শুরুতে ইরাকি বাহিনী প্রায় ওই ঘাঁটির অবস্থান শনাক্ত করে ফেলেছিল। সে সময় ইসরায়েলি বাহিনী সেখান থেকে ইরাকি বাহিনীর ওপর বিমান হামলা চালায়।

কীভাবে সামনে আসে ঘাঁটির তথ্য?
ওপেন-সোর্স বিশ্লেষকেরা স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে ইরাক-সৌদি সীমান্তের কাছাকাছি সন্দেহজনক একটি স্থানের সন্ধান পান বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

এর আগে গত বৃহস্পতিবার ইরাকের যৌথ অভিযানের উপ-প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল কায়েস আল-মুহাম্মাদাভি জানান, কারবালা ও নাজাফ মরুভূমি এলাকায় ‘অস্বাভাবিক ব্যক্তি বা যান চলাচলের’ তথ্য পেয়েছিল বাগদাদ।

তিনি বলেন, বিষয়টি তদন্তে কারবালা অপারেশন কমান্ডের তিনটি রেজিমেন্ট পাঠানো হয়। তবে সেখানে পৌঁছানোর পর বাহিনীটি তীব্র বিমান হামলার মুখে পড়ে। এতে একজন যোদ্ধা নিহত এবং আরও দু’জন আহত হন।

পরে সন্ত্রাসবিরোধী বাহিনীর দুটি রেজিমেন্ট অভিযান চালালেও তারা সেখানে কোনও ঘাঁটি খুঁজে পায়নি বলে দাবি করেন তিনি।

এদিকে ইসরায়েলের সাবেক বিমানবাহিনী প্রধান মেজর জেনারেল তোমের বার মার্চ মাসে বলেছিলেন, ইরানের বিরুদ্ধে সংঘাতে ইসরায়েলি বিশেষ বাহিনী ‘অসাধারণ’ কিছু অভিযান পরিচালনা করেছে। যদিও তিনি কোনও নির্দিষ্ট স্থানের নাম উল্লেখ করেননি।

গোয়েন্দা বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান হরাইজন এনগেজের প্রধান মাইকেল নাইটস বলেন, পশ্চিম ইরাকের বিস্তীর্ণ ও জনবিরল মরুভূমি গোপন সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের জন্য আদর্শ এলাকা।

স্থানীয় রাখালের সূত্রে ফাঁস?
বাগদাদ থেকে আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, নাজাফ মরুভূমির দুর্গম এলাকা অতীতেও গোপন সামরিক কর্মকাণ্ডের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। মার্চে এক স্থানীয় রাখাল ওই এলাকায় হেলিকপ্টার চলাচল দেখতে পেয়ে বিষয়টি জানালে ঘটনাটি সামনে আসে।

প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, পরে ওই রাখালের গাড়িকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয় এবং তিনি নিহত হন।

ইরাকের অবস্থান কী?
গোপন ইসরায়েলি ঘাঁটি নিয়ে ইরাকি কর্তৃপক্ষের বক্তব্যে ব্যাপক অসঙ্গতি দেখা গেছে।

গত সপ্তাহে আল-মুহাম্মাদাভি বলেছিলেন, ওই এলাকায় কোনও বিদেশি বাহিনীর উপস্থিতির অনুমতি বা সম্মতি ইরাক দেয়নি।

তবে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, মার্চের শেষ দিকে বাগদাদ গোপন সামরিক তৎপরতার অভিযোগ তুলে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানায় এবং বিষয়টিকে ইরাকের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করে।

অন্যদিকে মার্কিন কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, এমন কোনও অভিযানে ওয়াশিংটনের সরাসরি সম্পৃক্ততা ছিল না।

রবিবার তুর্কি বার্তাসংস্থা আনাদোলুকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইরাকের এক জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা মরুভূমিতে ইসরায়েলি ঘাঁটির খবর ‘ভিত্তিহীন’ বলে উড়িয়ে দেন।

সোমবার ইরাকি সামরিক বাহিনীও এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া বিবৃতিতে জানায়, দেশের ভেতরে কোনও অননুমোদিত বিদেশি বাহিনী কার্যক্রম পরিচালনা করছে না।

তবে একই দিনে বদর অরগানাইজেশনের এক আইনপ্রণেতা দাবি করেন, পশ্চিম ইরাকে ‘যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যৌথ সামরিক শিবির’ রয়েছে।

এছাড়া বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ শিয়া আল-সুদানির কার্যালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা দ্য নিউ আরব-কে বলেন, ‘আমেরিকার সহায়তা ও আড়ালে’ একটি গোপন সামরিক অভিযান পরিচালিত হয়েছিল।

তার ভাষ্য, “ইরাককে প্রতারণার শিকার হতে হয়েছে। এটি ইসরায়েলের গোয়েন্দা সক্ষমতার সাফল্য নয়, বরং মার্কিন সহযোগিতার ফল।”

আঞ্চলিক উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে ইরাক
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ইরাক ক্রমেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের টানাপোড়েনের মধ্যে পড়ে যাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, গোপন সামরিক ঘাঁটির অভিযোগ বাগদাদের জন্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

ওয়াশিংটন দীর্ঘদিন ধরেই ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে নিরস্ত্র করার জন্য ইরাকের ওপর চাপ দিয়ে আসছে। মার্চে বাগদাদ বিমানবন্দরে মার্কিন কূটনৈতিক ও লজিস্টিক স্থাপনায় হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস (পিএমএফ) বা হাশদ আল-শাবির অবস্থানে হামলা চালায়।

পিএমএফ ইরাকের নিয়মিত নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ হলেও এর মধ্যে কয়েকটি গোষ্ঠী সরাসরি ইরানপন্থী। এসব গোষ্ঠী অতীতে ইরাকসহ পুরো অঞ্চলে মার্কিন স্বার্থে হামলার দায় স্বীকার করেছে।

ইরানের প্রতিক্রিয়া
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সোমবার স্থানীয় গণমাধ্যমকে বলেন, “ইসরায়েলি শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে আমরা কোনও সম্ভাবনাই উড়িয়ে দিচ্ছি না। বিষয়টি অবশ্যই ইরাকি সরকারের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।”

তিনি আরও বলেন, “অঞ্চলে বিভেদ সৃষ্টি ও ইরানকে আঘাত করতে ইসরায়েল কোনও সীমারেখা মানে না- অতীত অভিজ্ঞতা সেটিই প্রমাণ করে।”

ইসরায়েলের নীরবতা
রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ইরাকের মরুভূমিতে গোপন সামরিক ঘাঁটি থাকার অভিযোগ নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনও মন্তব্য করেনি ইসরায়েলি সেনাবাহিনী।

তবে ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম কান রেডিও আগে জানিয়েছিল, ইরাকের মরুভূমিতে ইসরায়েলি সামরিক উপস্থিতির বিষয়টি কিছু আরব পক্ষ জানত।

বিশ্লেষকদের মতে, এসব অভিযোগ নতুন করে প্রশ্ন তুলছে- ইরাক কি ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের ছায়াযুদ্ধের গোপন যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হচ্ছে? সূত্র: আল-জাজিরা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here