শিল্প বাঁচাতে গভর্নরের কাছে একগুচ্ছ প্রস্তাব ব্যবসায়ীদের

0
শিল্প বাঁচাতে গভর্নরের কাছে একগুচ্ছ প্রস্তাব ব্যবসায়ীদের

উচ্চ সুদহার, গ্যাসসংকট, ডলারের চাপ এবং কমে যাওয়া বাজার চাহিদার কারণে দেশের উৎপাদন খাত বড় ধরনের সংকটে পড়েছে বলে জানিয়েছেন দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ীরা। তাঁরা বলেছেন, এরই মধ্যে বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্প-কারখানায় অর্থায়ন  না করে যেসব দুর্বল কারখানা এখনো টিকে আছে, সেগুলোকে সহায়তা দিলে শিল্প ও কর্মসংস্থান রক্ষা করা সম্ভব হবে।

গতকাল মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে বৈঠকে এই প্রস্তাব দেন দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ীরা। বৈঠক শেষে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন ব্যবসায়ী নেতা ও বিআইসি সভাপতি আনোয়ারুল আলম চৌধুরী পারভেজ।

তিনি জানান, শিল্প খাত সচল রাখতে কার্যকর মূলধন সহায়তা, সুদহার কমানো, পেনাল ইন্টারেস্ট হ্রাস এবং বিদেশি রিফাইন্যান্সিং সুবিধা বাড়ানোর দাবি জানানো হয়েছে।

গভর্নরের সঙ্গে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসাইন, জসীম উদ্দীন, বিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী, মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল, ট্রান্সকম গ্রুপের সিইও সিমিন রহমান, বিসিএমইএর চেয়ারম্যান মইনুল ইসলাম স্বপন, বিএমএএমএ সভাপতি মতিউর রহমান, বিজিএপিএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ শাহরিয়ার, বিসিআইয়ের সহসভাপতি প্রীতি চক্রবর্তী প্রমুখ।

আনোয়ারুল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, কভিড-পরবর্তী সময় থেকে শিল্প খাতে কার্যকর মূলধনের (ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল) সংকট তৈরি হয়েছে। পরে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়া, সুদহার বৃদ্ধি, টাকার অবমূল্যায়ন ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়েছে। এতে উৎপাদন খাত বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়েছে।

তিনি বলেন, ‘বর্তমান সরকারও মনে করে, অর্থনীতি শক্তিশালী করতে হলে শিল্প খাত টিকিয়ে রাখতে হবে। সেই জায়গা থেকেই আমরা গভর্নরের কাছে কিছু প্রস্তাব দিয়েছি, যাতে বিদ্যমান কারখানাগুলো সচল রাখা যায় এবং আরো শক্তিশালী করা সম্ভব হয়।’

ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে এলসি সীমা (এলসি লিমিট) নিয়ে জটিলতা কমানোর দাবি জানানো হয়। তাঁরা বলেন, যেসব এলসি সীমা অতিক্রম করেছে, সেগুলো ব্লক করে মূল সীমা সচল রাখলে ব্যবসা পরিচালনা সহজ হবে। পাশাপাশি বিদেশি তহবিল ও রিফাইন্যান্সিং সুবিধা বাড়ানোর প্রস্তাবও দেওয়া হয়, যাতে কম সুদে অর্থায়ন পাওয়া যায় এবং ব্যবসার ব্যয় কমে।

সুদহার প্রসঙ্গে পারভেজ বলেন, ব্যাংকগুলোর তহবিল ব্যয় ৮ থেকে ১০ শতাংশের বেশি নয়। এর পরও অতিরিক্ত স্প্রেড যোগ করে ঋণের সুদ ১৪-১৫ শতাংশে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সরকার চাইলে এই স্প্রেড কমিয়ে শিল্প খাতকে কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে।

তিনি আরো বলেন, ঋণখেলাপি হওয়ার পর অতিরিক্ত পেনাল ইন্টারেস্ট আরোপ করাও শিল্পের জন্য বড় চাপ তৈরি করছে। শিল্প-কারখানাকে শাস্তি না দিয়ে বরং কিভাবে তারা ঋণ পরিশোধে সক্ষম হয়, সেই পরিবেশ তৈরি করা উচিত।

সিআইবি রিপোর্টে ‘গ্রুপ কনসেপ্ট’ নিয়েও আপত্তি তোলেন ব্যবসায়ীরা। তাঁদের অভিযোগ, একই পরিচালক থাকার কারণে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে একসঙ্গে গ্রুপ হিসেবে দেখানো হয়। ফলে একটি কম্পানি সমস্যায় পড়লে অন্য ভালো প্রতিষ্ঠানও নেতিবাচক সিআইবি রিপোর্টের কারণে ব্যাবসায়িক ক্ষতির মুখে পড়ে। তাঁরা প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে আলাদাভাবে মূল্যায়নের দাবি জানান।

এমএসএমই খাত নিয়েও গভর্নরের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে বলে জানান পারভেজ। তিনি বলেন, ব্যাংকগুলো ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অর্থায়নে অনাগ্রহী। এ ছাড়া জটিল কমপ্লায়েন্স প্রক্রিয়া সহজ করা, ভেঞ্চার ক্যাপিটাল চালু এবং স্বল্প সুদে ঋণ সুবিধা দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক আমাদের প্রস্তাবগুলো ইতিবাচকভাবে শুনেছে। গভর্নর জানিয়েছেন, ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল, বিদেশি রিফাইন্যান্সিং ও পেনাল ইন্টারেস্টসহ বিভিন্ন বিষয়ে কাজ চলছে। খুব শিগগিরই কিছু সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলেও তিনি আশ্বাস দিয়েছেন।’ এই ব্যবসায়ী নেতা বলেন, ‘আমাদের উদ্দেশ্য একটাই—শিল্প-কারখানা বাঁচাতে হবে। কারণ একটি কারখানা বন্ধ হয়ে গেলে সেটি পুনরায় সচল করা অত্যন্ত কঠিন। তাই যেগুলো এখনো চালু আছে, সেগুলো টিকিয়ে রাখতে দ্রুত সহায়তা প্রয়োজন।’ তিনি আরো বলেন, অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান গ্যাসসংকট, গ্যাসের মূল্য ২৮৬ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি, উচ্চ সুদহার ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বিপদে পড়েছে। শিল্প শুধু ব্যক্তির সম্পদ নয়, এটি জাতীয় সম্পদ। তাই সম্ভাবনাময় শিল্পগুলো টিকিয়ে রাখতে সরকারের বিশেষ সহায়তা প্রয়োজন।

তহবিল সহায়তা প্রসঙ্গে পারভেজ বলেন, রপ্তানি খাতের ক্যাশ ইনসেনটিভের অর্থ এপ্রিল পর্যন্ত ছাড়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে গভর্নর জানিয়েছেন। এ ছাড়া গার্মেন্টস খাতের শ্রমিকদের বেতন সহায়তার প্রয়োজনীয়তা কমে এসেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘বর্তমান গভর্নরের নেতৃত্বে শিল্প খাত টিকিয়ে রাখার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক আন্তরিক বলে আমরা আশ্বস্ত হয়েছি।’

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here