ইসলামের চতুর্থ খলিফা হজরত আলী (রা.)-এর মাজার সংলগ্ন বিশাল প্রাঙ্গণ এখন নিস্তব্ধ। ইরাকের নাজাফ শহরটি একসময় অঞ্চলটিতে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা লাখ লাখ মানুষের পদচারণা ও প্রার্থনায় মুখরিত থাকত। সেখানে এখন শুধুই শূন্যতা।
মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক যুদ্ধের কারণে ইরান, লেবাননসহ বিভিন্ন দেশ থেকে দর্শনার্থী বা মাজার জিয়ারতকারীদের আগমন একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে ধর্মীয় পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল স্থানীয় ব্যবসায়ীরা চরম অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছেন।
নাজাফের পুরোনো বাজারের গহনার দোকানদার আবদেল রহিম হারমুশ (৭১) বলেন, ‘আগে প্রচুর ইরানিরা আসতেন, তাদের জন্য গহনার ব্যবসায়ী, কাপড়ের দোকানদার, ট্যাক্সি ড্রাইভার সবাই ব্যস্ত থাকতেন। এখন কেউ নেই। অন্যান্য বিদেশিদের ভিড়েও বাজারে ঢোকাই কঠিন ছিল, রাস্তায় হকারদের কাছেও দর্শনার্থী জমে যেত।’
৩৮ বছর ধরে মাজারের কাছে ব্যবসা করা এই ব্যবসায়ী বলেন, সংকট অব্যাহত থাকলে দোকান মালিকরা ভাড়া-কর দিতে পারবেন না, ট্যাক্সি চালকরা যাত্রীহীন হয়ে পড়বেন। আর শ্রমিকরাও কাজ হারাবেন।
নাজাফের এক হোটেল মালিক আবু আলী পাঁচজন কর্মচারীকে ছাঁটাই করেছেন। তার প্রায় ৭০টি রুম এখন খালি। তিনি বলেন, ‘কাজ না থাকলে বেতন দেব কীভাবে?’
শহরটির হোটেল সমিতির প্রধান সায়েব আবু ঘনেইম জানিয়েছেন, শহরের ২৫০টি হোটেলের ৮০ শতাংশ বন্ধ হয়ে গেছে। ২,০০০-এর বেশি কর্মচারীকে ছাঁটাই করা হয়েছে বা বিনা বেতনে ছুটিতে পাঠানো হয়েছে।
তিনি জানান, দেশটিরন ধর্মীয় পর্যটকদের অধিকাংশ ইরানি। তারপর আছে লেবানিজ ও অন্যান্য দেশের বাসিন্দারা।
কারবালার অবস্থাও একই
নাজাফ থেকে ৮০ কিলোমিটার দূরের পবিত্র শহর কারবালার পরিস্থিতিও একেবারে হুবহু একই। ইমাম হুসাইন (আ.) ও আব্বাসের মাজার সংলগ্ন করিডোর ও বাজারগুলো ফাঁকা। পর্যটন কমিটির প্রধান ইসরা আল-নাসরাভি বলেন, ‘পরিস্থিতি বিপজ্জনক এটি একটি বিপর্যয়।’ যুদ্ধের কারণে পর্যটকের সংখ্যা প্রায় ৯৫ শতাংশ কমে গেছে এবং শত শত হোটেল বন্ধ হয়ে গেছে।
ভ্রমণ সংস্থার মালিক আকরাম রাদি জানান, তার কোম্পানি একসময় মাসে ১,০০০ দর্শনার্থীকে সেবা দিত, এখন সক্ষমতার মাত্র ১০ শতাংশে চলছে। তিনি বলেন, ‘হয়তো ব্যবসা বন্ধ করে অন্য চাকরি খুঁজতে হবে।’
কারণ কি?
ফেব্রুয়ারির শেষে ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা শুরু হয়। এই যুদ্ধে ইরাকও জড়িয়ে পড়েছে। দেশটিতে মার্কিনস্বার্থ ও ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোকে লক্ষ্য করে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে ইরান, লেবানন, আফগানিস্তান, ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে তীর্থযাত্রী আসা বন্ধ হয়ে যায়।
গত ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর ইরাক সরকার আকাশসীমা খুলে দেয়। তবে দর্শনার্থীদের সংখ্যা সেভাবে বাড়েনি। বিশেষ করে সপ্তাহের দিনগুলোতে মাজারের চত্বরে হাতেগোনা কয়েকজন জিয়ারতকারীকে দেখা যায়। শুধু সাপ্তাহিক ছুটির দিনে স্থানীয় ইরাকি জিয়ারতকারীরা ঘুরতে এলে কিছুটা প্রাণ ফিরে পায় শহর।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ধর্মীয় পর্যটন ইরাকের তেল-বহির্ভূত অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাত। কোভিড-১৯ মহামারির পর ব্যাপক লোকসান কাটিয়ে ওই শিল্প ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছিল। কিন্তু নতুন এ যুদ্ধ ইরাকের ধর্মীয় শহরগুলোকে আবারও গভীর দারিদ্র আর অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে।

