ডিবির সোর্স জালাল হত্যা : দুই পুলিশ সদস্যসহ ৩ আসামির যাবজ্জীবন

0
ডিবির সোর্স জালাল হত্যা : দুই পুলিশ সদস্যসহ ৩ আসামির যাবজ্জীবন

দুই যুগেরও বেশি সময় আগে রাজধানীর মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ে সোর্স জালাল আহমেদ শফিকে হত্যার ঘটনায় দুই পুলিশ সদস্যসহ তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত।

বৃহস্পতিবার আলোচিত এ মামলার রায় ঘোষণা করেন ঢাকার চতুর্থ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মোসাদ্দেক মিনহাজ। আজ রবিবার রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেন সংশ্লিষ্ট আদালতের বেঞ্চ সহকারী সায়েদুর রহমান।

যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন, হাবিলদার মো. বিল্লাল হোসেন, কনস্টেবল মো. আবদুর রউফ ও ডিবির ক্যান্টিন পরিচালক মো. আনোয়ার হোসেন।

সংশ্লিষ্ট আদালতের বেঞ্চ সহকারী সায়েদুর রহমান বলেন, কারাদণ্ডের পাশাপাশি তিন আসামির প্রত্যেককে ১০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড, অনাদায়ে আরও এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

আসামিরা পলাতক থাকায় আদালত তাদের বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানাসহ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে।

এ মামলায় অভিযুক্ত পাঁচ আসামির মধ্যে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক মো. জিয়াউল হাসান মামলার বিচার চলাকালে মারা গেছেন। আর পুলিশ কনস্টেবল আব্দুল মালেকের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাকে খালাস দেওয়া হয়েছে।

১৯৯৯ সালের ২৫ মার্চ মিন্টো রোডে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়ে ছাদের পানির ট্যাংক থেকে জালালের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

ওই ঘটনায় মরদেহ শনাক্ত হওয়ার আগেই ১৯৯৯ সালের ২৬ মার্চ রমনা থানার অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেন তৎকালীন এসআই এসএম আলী আজম সিদ্দিকী। লাশ শনাক্ত হওয়ার পর ওই বছর ৪ এপ্রিল নিহতের ছেলে আব্বাসউদ্দিন আরেকটি মামলা করেন।

মামলার এজাহার অনুযায়ী, জালাল ছিলেন মাইক্রোবাস চালক। প্রথমে নিজের মাইক্রোবাস চালাতেন। পরে নিজের মাইক্রোবাস বিক্রি করে ভাড়ায় চালাতেন। ডিবি পুলিশ কোনো গাড়ি রিকুইজিশন করলে গাড়ি চালানোর জন্য তাকে ডাকা হতো। সেই কারণে ডিবি অফিসের সঙ্গে তার সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে।

আসামি জিয়াউল হাসান ও এসআই আরজু প্রায়ই তাকে ডেকে নিতেন। ১৯৯৯ সালের ২০ মার্চ মোহাম্মদপুর থানাধীন লালমাটিয়ার বাসা থেকে গাড়ির লাইসেন্স ও চেক বই নিয়ে রাত ৩টায় ডিবি অফিসের উদ্দেশে বের হন জালাল। তারপর কয়েক দিন বাড়িতে না ফেরায় পরিবারে ধারণা হয়, তিনি ঢাকার বাইরে গেছেন।

ওই বছর ৩১ মার্চ কয়েকজন লোক বাসায় এসে জালালের ছবি দেখিয়ে পরিচয় জানতে চায়। এরপর পরিবারের লোকজন ঢাকা মেডিকেলে গিয়ে জালালের মরদেহ শনাক্ত করে।

হত্যাকাণ্ডের মাত্র ৫ মাসের মধ্যে ১৯৯৯ সালের ৯ আগস্ট আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন সিআইডির তৎকালীন সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মুন্সি আতিকুর রহমান।

সেখানে হত্যার কারণ সম্পর্কে বলা হয়, জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলাকায় (বর্তমান শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর) অবৈধ স্বর্ণ, হেরোইন ও মাদক চোরাচালানের তথ্য পাওয়ার জন্য জালালকে ‘সোর্স’ হিসাবে ব্যবহার করতেন মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) পরিদর্শক জিয়াউল আহসান। এ জালালের তথ্যের ভিত্তিতে চোরাকারবারিদের আটক করে চোরাচালানের পণ্য হস্তগত করতেন মামলার আসামিরা। কিন্তু জালালকে তার ভাগ থেকে বঞ্চিত করা হতো।

১৯৯৯ সালের ১৩ মার্চ জালাল বিমানবন্দর এলাকায় একটি সোনা চোরাচালানকারী চক্রের তথ্য অন্য একটি গোয়েন্দা দলকে দেওয়ায় ক্ষুব্ধ হন জিয়াউল। ১৯ মার্চ রাতে অন্য আসামিদের সহযোগিতায় জালালকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে খুন করা হয়। আর মরদেহ লুকানো হয় ডিবি কার্যালয়ের ছাদে পানির ট্যাংকের ভেতরে। ওই ঘটনা সেই সময় ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। 

২০০০ সালের ১০ জুলাই অভিযোগ গঠন করে আসামিদের বিচার শুরু করে আদালত। উচ্চ আদালতের কোনো স্থগিতাদেশ না থাকলেও রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষ্য উপস্থাপন না করতে পারায় বিচার শেষ হতে দুই যুগ পার হয়ে যায়।

বিচারের একপর্যায়ে মামলা পরিচালনায় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীর বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগ ওঠে। পরে ২০০১ সালের ২৮ জানুয়ারি এক আদেশে পিপি পরিবর্তন এবং মামলাটির দ্রুত নিষ্পত্তির নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।

মামলার বিচার চলাকালে মোট ২৬ জনের সাক্ষ্য শুনেছে আদালত। আসামিদের আত্মপক্ষ শুনানি, মামলার যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে তিনজনকে দোষী সাব্যস্ত করে রায় দিলেন বিচারক।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here