যুদ্ধের কারণে ঝুঁকিতে এশিয়ার খাদ্য নিরাপত্তা

0
যুদ্ধের কারণে ঝুঁকিতে এশিয়ার খাদ্য নিরাপত্তা

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের উত্তাপ এবার কেবল তেলের বাজারে সীমাবদ্ধ নেই বরং সরাসরি আঘাত হেনেছে এশিয়ার কোটি কোটি মানুষের পাতের ভাতে। সম্প্রতি ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সংঘাতের জেরে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে সারের সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। এর ফলে থাইল্যান্ড থেকে ভিয়েতনামের মতো এশিয়ার বিস্তীর্ণ শস্যভাণ্ডারে চাষাবাদ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন প্রান্তিক কৃষকরা। কৃষি উপকরণের আকাশচুম্বী দাম এবং দুষ্প্রাপ্যতা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার খাদ্য উৎপাদনে এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

থাইল্যান্ডের চাচোয়েংসাও প্রদেশের প্রবীণ কৃষক সুচার্ত পিয়ামসোম্বুন সারের জন্য স্থানীয় দোকানে গিয়ে খালি হাতে ফিরে এসেছেন। গত এক মাসে সারের দাম বস্তা প্রতি ৮০০-৯০০ বাথ থেকে বেড়ে ১,১০০ বাতের বেশি হয়ে গেছে এবং সরবরাহ প্রায় বন্ধ। সুচার্তের মতো অনেক কৃষকই এখন আর লোকসান দিয়ে চাষ করতে চাইছেন না। তারা বলছেন, চাষ করে ঋণের বোঝা বাড়ানোর চেয়ে দিনমজুরি করে জীবন ধারণ করা অনেক বেশি নিরাপদ। কৃষকদের এই চাষ বিমুখতা আগামী দিনগুলোতে এশিয়ার চালের বাজারে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বিশ্বের সামুদ্রিক পথে পরিবাহিত সারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই এই হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াত করে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলার পর থেকে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় ইউরিয়া সারের দাম মাত্র কয়েক সপ্তাহে ৪০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে সারের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সারা বিশ্বের নজর এখন চীনের দিকে। বিশ্বের বৃহত্তম সার উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে চীন গত বছর বিশ্ব উৎপাদনের ২৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে তারা নিজেদের অভ্যন্তরীণ বাজার সামাল দিতে রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে।

চীন সরকার চলতি বছরের মার্চ মাসে বিভিন্ন ধরনের সার রপ্তানিতে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। দেশটির রাজনৈতিক অগ্রাধিকার এখন নিজেদের শস্যের স্বয়ংসম্পূর্ণতা নিশ্চিত করা এবং অভ্যন্তরীণ বাজার স্থিতিশীল রাখা। চীনের শানডং প্রদেশের সার রপ্তানিকারকরা জানিয়েছেন, বহু দেশের সাথে তাদের আগে থেকে চুক্তি থাকলেও সরকারি নির্দেশনার কারণে তারা এখন পণ্য পাঠাতে পারছেন না। চীন এখন কেবল নিম্নমানের অ্যামোনিয়াম সালফেট রপ্তানি করছে, যা ধান চাষের মতো প্রধান খাদ্যশস্য উৎপাদনের জন্য যথেষ্ট নয়।

চীনের এই রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার সরাসরি প্রভাব পড়েছে ভিয়েতনামের মতো বড় চাল উৎপাদনকারী দেশগুলোর ওপর। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে ভিয়েতনামের মোট সার আমদানির অর্ধেকের বেশি এসেছে চীন থেকে। ভিয়েতনামের কৃষকরা যদি পর্যাপ্ত সার না পায়, তবে তার প্রভাব পড়বে ফিলিপাইন এবং আফ্রিকার দেশগুলোর ওপর, যারা ভিয়েতনামের চালের ওপর নির্ভরশীল। এই সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিটি ধাপ এখন একে অপরের সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত, যেখানে একটি লিঙ্কে ফাটল ধরা মানেই পুরো এশিয়ার খাদ্য নিরাপত্তায় ধস নামা।

ফিলিপাইনের পরিস্থিতি আরও নাজুক, কারণ তারা তাদের প্রয়োজনীয় সারের ৭৫ শতাংশের জন্য সরাসরি চীনের ওপর নির্ভর করে। দেশটিতে নিজস্ব সার উৎপাদনের কোনো সক্ষমতা নেই বললেই চলে। একদিকে সারের জন্য চীনের ওপর নির্ভরতা, অন্যদিকে চালের জন্য ভিয়েতনামের ওপর নির্ভরতা ফিলিপাইনকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। একইভাবে থাইল্যান্ডও তাদের সারের বড় একটি অংশ চীন এবং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করে থাকে, যা এখন উভয় দিক থেকেই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এই সংকটের প্রকৃত প্রভাব এখনই খাদ্যপণ্যের দামে দেখা যাবে না। সারের অভাবে এই মৌসুমে যে ফসল রোপণ করা সম্ভব হচ্ছে না, তার ফলাফল বোঝা যাবে বছরের শেষে ফসল কাটার সময়। যদি এই সংকট দীর্ঘায়িত হয়, তবে এশিয়ার প্রধান চাল উৎপাদনকারী দেশগুলোতে ফলন মারাত্মকভাবে হ্রাস পাবে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির প্রাক্কলন অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত এবং তার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ফলে ২০২৬ সালে অতিরিক্ত ৪৫ মিলিয়ন মানুষ তীব্র ক্ষুধার সম্মুখীন হতে পারে।

কৃষকদের মধ্যে এখন চাপা ক্ষোভ এবং হতাশা বিরাজ করছে। ব্যাংককের প্রান্তিক কৃষকরা আক্ষেপ করে বলছেন, সরকার হয়তো কৃষকদের দুর্দশা তখনই বুঝবে যখন দেশে চালের তীব্র সংকট দেখা দেবে। এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা ২৪ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ার যে আশঙ্কা করা হচ্ছে, তা সাম্প্রতিক ইতিহাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্র থেকে হাজার মাইল দূরে এশিয়ার সবুজ ধানক্ষেতগুলো এখন সারের অভাবে ধুঁকছে, যা শেষ পর্যন্ত এক বৈশ্বিক খাদ্য সংকটেরই পদধ্বনি দিচ্ছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here