ওয়াশিংটন ডিসিতে ঐতিহাসিক সফরে মার্কিন কংগ্রেসের যৌথ অধিবেশনে ভাষণ দেওয়ার সময় ব্রিটিশ রাজা তৃতীয় চার্লস পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর গুরুত্ব তুলে ধরে আবেগঘন বক্তব্য দিয়েছেন। বর্তমানে আমেরিকা ও ইউরোপ যেসব বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করছে, তা কোনো একক জাতির পক্ষে সামলানো সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে এই জোট অটুট রাখার আহ্বান জানান। গত কয়েক দশকে আটলান্টিক মহাসাগরের দুই পাড়ের দেশগুলোর মধ্যে যে অবিচ্ছেদ্য অংশীদারিত্ব গড়ে উঠেছে, তাকে আধুনিক বিশ্বের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে অভিহিত করেন তিনি।
সম্প্রতি ইরান ইস্যুতে ইউরোপীয় মিত্ররা আমেরিকার সামরিক অভিযানে যোগ না দেওয়ায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ন্যাটো থেকে সরে আসার হুমকি দিয়েছিলেন। দ্য টেলিগ্রাফে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্পের সেই কঠোর অবস্থানের পরই রাজার এই সফরকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। রাজা চার্লস তার ভাষণে স্মরণ করিয়ে দেন যে, ৯/১১ হামলার পর ন্যাটোর ইতিহাসে একমাত্র ব্রিটেনের উদ্যোগেই যৌথ আত্মরক্ষার ধারাটি সক্রিয় করা হয়েছিল। তিনি বলেন, ইতিহাস ও অভিন্ন মূল্যবোধের ওপর ভিত্তি করে তৈরি এই জোট কেবল অতীতের অর্জনে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, বরং একে ভবিষ্যতের জন্য আরও শক্তিশালী করতে হবে।
বাকিংহাম প্যালেসের পক্ষ থেকে এই সফরকে দুদেশের কূটনৈতিক টানাপোড়েন নিরসনের একটি মাধ্যম হিসেবে দেখা হলেও হোয়াইট হাউসের রাষ্ট্রীয় নৈশভোজে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কিছু মন্তব্য নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান যাতে পরমাণু অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, সেই মিশনে রাজা চার্লস তাকে সমর্থন জানিয়েছেন। ট্রাম্প আরও বলেন যে তারা ব্যক্তিগত বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং রাজা তার কৌশলের সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন। যদিও ব্রিটিশ রাজপরিবার প্রথাগতভাবে সরাসরি রাজনৈতিক বিষয়ে কোনো পক্ষ নেয় না, তবুও ট্রাম্পের এই মন্তব্য ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমারের জন্য অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।
ইউক্রেন যুদ্ধের বিষয়েও রাজা চার্লস অত্যন্ত দৃঢ় অবস্থান ব্যক্ত করেন এবং রাশিয়ার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কিয়েভকে সামরিক সহায়তা অব্যাহত রাখার গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আজ যখন স্বাধীনতা আবারও আক্রান্ত, তখন ইউক্রেনের সাহসী মানুষদের রক্ষায় আগের মতোই একতাবদ্ধ থাকা প্রয়োজন। উল্লেখ্য যে, জো বাইডেনের মেয়াদের তুলনায় ট্রাম্প প্রশাসন ইউক্রেনকে আর্থিক ও সামরিক সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে বেশ শিথিলতা দেখাচ্ছে এবং রাশিয়ার সঙ্গে আপস আলোচনার মাধ্যমে ভূখণ্ড ছেড়ে দেওয়ার মতো প্রস্তাবের দিকে ইঙ্গিত দিচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে রাজার এই প্রত্যক্ষ আহ্বান মার্কিন নীতি নির্ধারকদের ওপর নৈতিক চাপ সৃষ্টি করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পরিবেশ রক্ষা এবং আমেরিকার প্রাকৃতিক সম্পদের সংরক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করার পাশাপাশি রাজা চার্লস তার বক্তব্যে অত্যন্ত সংবেদনশীল কিছু সামাজিক সমস্যার কথাও উল্লেখ করেছেন। যদিও তিনি সরাসরি জেফরি এপস্টাইনের নাম উচ্চারণ করেননি, তবে ব্রিটিশ ও আমেরিকান সমাজে টিকে থাকা বিভিন্ন ‘সামাজিক ব্যাধি’র শিকার হওয়া ব্যক্তিদের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করেছেন। প্রিন্স অ্যান্ড্রুর সঙ্গে এপস্টাইনের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বের জেরে বর্তমানে রাজপরিবার যে চাপের মুখে রয়েছে, রাজার এই বক্তব্য সেই বিতর্কিত অধ্যায়ে ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি এক ধরনের স্বীকৃতির ইঙ্গিত দেয় বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
কংগ্রেসে রাজার এই ভাষণ রিপাবলিকান এবং ডেমোক্র্যাট উভয় দলের সদস্যদের কাছ থেকেই ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছে এবং বেশ কয়েকবার দাঁড়িয়ে সম্মান জানানো হয়েছে তাকে। সাউথ ক্যারোলিনার সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম এই ভাষণকে কংগ্রেসের জন্য একটি ‘মনোবল বৃদ্ধিকারী’ ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। হাস্যরসের মাধ্যমে শুরু করা ভাষণে রাজা চার্লস যেভাবে ইতিহাস এবং বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন, তাতে মুগ্ধতা প্রকাশ করেছেন সাধারণ নাগরিক ও রাজনীতিকরা। এমনকি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেই রাজার ভাষণের প্রশংসা করে রসিকতা করে বলেছেন, এমন চমৎকার বক্তব্যের জন্য তিনি রাজার প্রতি কিছুটা ঈর্ষান্বিত।
ট্রাম্পের পূর্ববর্তী কঠোর মন্তব্য যে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার সম্পর্কের ফাটল ধরিয়েছিল, রাজার এই সফর সেই শীতলতা কাটাতে কিছুটা হলেও সক্ষম হয়েছে। কিয়ার স্টারমার যখন ট্রাম্পের ইরান অভিযানে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন, তখন থেকেই দুই নেতার মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়। রাজা তার ভাষণে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর সুরেই প্রতিধ্বনি করেছেন, এই অংশীদারিত্ব অপরিহার্য এবং গত আশি বছরে অর্জিত সাফল্যগুলোকে তুচ্ছ করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। বরং এই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই সামনের দিনগুলোর জটিল সামরিক ও প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।
সূত্র: টেলিগ্রাফ

