বিদেশি বিনিয়োগে প্রতিযোগীদের চেয়ে বহু পিছিয়ে বাংলাদেশ

0
বিদেশি বিনিয়োগে প্রতিযোগীদের চেয়ে বহু পিছিয়ে বাংলাদেশ

বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে নতুন এক আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে। ২০২৪ সালের হিসাব বলছে, আঞ্চলিক প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ শুধু পিছিয়েই নেই, বরং ব্যবধানটি এখন কয়েক গুণে পৌঁছেছে। বিশেষ করে ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও কম্বোডিয়ার মতো দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশের বিনিয়োগ সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিনিয়োগ ভবনে গত সোমবার আয়োজিত এক উচ্চ পর্যায়ের সংলাপে জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা আংকটাড, ইউএনডিপি এবং বিডা যৌথভাবে ‘ইনভেস্টমেন্ট পলিসি রিভিউ (আইপিআর) ইমপ্লিমেন্টেশন রিপোর্ট’ প্রকাশ করে। এতে গত এক দশকের অগ্রগতি মূল্যায়নের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ করণীয়ও তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশের এফডিআই স্টক দাঁড়িয়েছে প্রায় এক হাজার ৮২৯ কোটি ডলারে। বিপরীতে একই সময়ে ভিয়েতনামের এফডিআই স্টক ২৪ হাজার ৯১৪ কোটি ডলার, ইন্দোনেশিয়ার ৩০ হাজার ৫৬৬ কোটি ডলার এবং কম্বোডিয়ার পাঁচ হাজার ২৬৬ কোটি ডলার। অর্থাৎ বাংলাদেশের তুলনায় ভিয়েতনাম প্রায় ১৩ গুণ, ইন্দোনেশিয়া ১৭ গুণ এবং কম্বোডিয়া প্রায় তিন গুণ এগিয়ে রয়েছে।

এই ব্যবধানের মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে বাংলাদেশে এফডিআই প্রবাহের ধারাবাহিক দুর্বলতা। ২০১৯ সালে যেখানে দেশে বিদেশি বিনিয়োগপ্রবাহ ১৮০ কোটির বেশি ডলারে পৌঁছেছিল, সেখানে ২০২৪ সালে তা প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমে যায়। এমনকি কভিড-১৯ মহামারি শুরুর সময়ের তুলনায়ও বিনিয়োগপ্রবাহ কমে যাওয়ার বিষয়টি উদ্বেগজনক হিসেবে দেখা হচ্ছে। যদিও এ সময়ে মোট এফডিআই স্টক তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ছিল, যা প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি অবস্থান করেছে।

অনুষ্ঠানে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন বলেন, ২০১৩ সালের পর থেকে এফডিআই আকর্ষণে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি। জিডিপির তুলনায় বিনিয়োগের হারও বাড়েনি বরং কিছু ক্ষেত্রে কমেছে। তাঁর মতে, পরিকল্পনা ও নীতিগত সুপারিশের অভাব নেই, কিন্তু বাস্তবায়নের দুর্বলতার কারণেই কাঙ্ক্ষিত ফল আসছে না। এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে ‘গতি পরিবর্তন’ বা নতুন ধাঁচের সংস্কার জরুরি বলে তিনি মনে করেন।

প্রতিবেদনটি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কয়েকটি কাঠামোগত ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপে বিনিয়োগ পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

২০২১ সালের পর থেকে টাকার প্রায় ৩৬ শতাংশ অবমূল্যায়ন এবং বৈদেশিক মুদ্রার সংকট আমদানি ব্যয় বাড়িয়ে দেয় ও বিল পরিশোধে বিলম্ব সৃষ্টি করে। বিশেষ করে জ্বালানি আমদানিতে সীমাবদ্ধতা শিল্প উৎপাদনকে ব্যাহত করে, যা বিনিয়োগকারীদের জন্য অনিশ্চয়তা ও ব্যয় উভয়ই বাড়িয়েছে।
একই সময়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটের পরিবর্তনও বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তৈরি পোশাক খাতের কিছু কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনাগুলো বিনিয়োগকারীদের আস্থায় ধাক্কা দেয়। সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকগুলোর অবনতিও পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে—২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশ থেকে ৪ শতাংশে নেমে আসে, আর মূল্যস্ফীতি প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ১০ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছায়।

তবে আশার কথা হলো ২০২৫ সালের প্রাথমিক সূচকে কিছুটা পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। পুনর্বিনিয়োগকৃত আয় এবং আন্ত প্রতিষ্ঠান ঋণের মাধ্যমে এফডিআইপ্রবাহ আবার বাড়তে শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের পূর্বাভাস অনুযায়ী, সামষ্টিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরলে বিনিয়োগ পরিস্থিতিও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে পারে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here