পারস্য উপসাগরের নীল জলরাশিতে ভেসে বেড়াচ্ছে প্রাণঘাতী নৌ-মাইন। হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়ার সময় পণ্যবাহী জাহাজে গর্জে উঠছে ইরানি স্পিডবোটের মেশিনগান। আশির দশকের সেই স্মৃতি আজ আবার ফিরে এসেছে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত উপকূলে। তবে এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সাম্প্রতিক সংঘাত ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির মধ্য দিয়ে গেলেও সমুদ্রপথে উত্তেজনা থামেনি। বরং হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিশ্চিত করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ঐতিহাসিক ‘ট্যাঙ্কার যুদ্ধ’ শুরু হয়েছিল গত শতাব্দীর আশির দশকে ইরাক-ইরান যুদ্ধের সময়। তখন কুয়েতি তেলের ট্যাঙ্কারগুলোকে নিরাপত্তা দিতে মার্কিন নৌবাহিনী ‘অপারেশন আর্নেস্ট উইল’ শুরু করেছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশ্লেষকদের মনে প্রশ্ন জেগেছে, ওয়াশিংটন কি আবারও সেই একই মডেলে জাহাজগুলোকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি নেবে? বিশ্ব বাণিজ্যের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই রুট বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্ব অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সম্প্রতি হরমুজ প্রণালিতে ইরানের বিপ্লবী গার্ড দুটি পণ্যবাহী জাহাজ জব্দ করার পর উত্তেজনা আরও বেড়েছে। তারা ছোট ছোট দ্রুতগামী বোটগুলো বিশালকার কন্টেইনার জাহাজকে ঘিরে ফেলে গুলিবর্ষণ করে এবং এরপর অস্ত্রধারী সেনারা জাহাজে উঠে পড়ে। মার্কিন অবরোধের মুখে থাকা ইরান সীমিত শক্তি ব্যবহার করেও কীভাবে বিশ্ব বাণিজ্যকে জিম্মি করতে পারে, এই ঘটনা তারই একটি বড় প্রমাণ। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতোমধ্যে ইরানি স্পিডবোটগুলোকে দেখা মাত্র গুলির নির্দেশ দিলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সহজ হচ্ছে না।
আশির দশকের সাথে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা করলে দেখা যায়, সামরিক প্রযুক্তি এখন অনেক বেশি আধুনিক ও জটিল। সে সময় শুধু মাইন আর সীমিত ক্ষেপণাস্ত্রের ভয় ছিল, কিন্তু এখন ড্রোন আর নিখুঁত নিশানার স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র যুক্ত হয়েছে। ঝুঁকি বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান যুগে কোনো জলপথকে শতভাগ নিরাপদ করা প্রায় অসম্ভব। ইরান যদি মাত্র একটি ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাতে সক্ষম হয়, তবেই পুরো নিরাপত্তা বলয় নিয়ে প্রশ্ন উঠে যাবে এবং আন্তর্জাতিক জাহাজ কোম্পানিগুলো আর ঝুঁকি নিতে চাইবে না।
অতীতের ‘ট্যাঙ্কার যুদ্ধ’ কিন্তু মোটেও রক্তপাতহীন ছিল না। কুয়েতি জাহাজকে পাহারা দিতে গিয়ে মার্কিন রণতরী ব্রিজটন মাইনের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এমনকি ভুলবশত ইরানের একটি যাত্রীবাহী বিমান নামিয়ে এনে ২৯০ জন সাধারণ মানুষকে হত্যা করেছিল মার্কিন বাহিনী। সেই তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে অনেক ইউরোপীয় দেশ এখনই মার্কিন নেতৃত্বাধীন কোনো নতুন এসকর্ট মিশনে যোগ দিতে রাজি হচ্ছে না। তারা মনে করছে, বর্তমান যুদ্ধ পুরোপুরি শেষ না হওয়া পর্যন্ত সাগরে সামরিক পাহারা দিয়ে স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
আশির দশকে রোনাল্ড রিগ্যান প্রশাসনের লক্ষ্য ছিল খুব স্পষ্ট এবং সংকীর্ণ, কেবল জলপথ খোলা রাখা। কিন্তু বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসনের লক্ষ্য নিয়ে এক ধরনের অস্পষ্টতা রয়েছে বলে মনে করেন সাবেক কূটনীতিকরা। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কখনো সরকার পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেওয়া হচ্ছে, আবার কখনো অন্য কোনো বড় রাজনৈতিক স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। লক্ষ্যের এই অস্থিতিশীলতা সামরিক অভিযানের সাফল্যকে অনিশ্চিত করে তুলছে।
লোহিত সাগরে হুথি বিদ্রোহীদের হামলার মুখে মার্কিন নৌবাহিনী সাম্প্রতিক সময়ে সীমিত আকারে জাহাজ পাহারার কাজ করেছে। তবে সেটি ছিল মূলত মার্কিন পতাকাবাহী বা মার্কিন সরকারের পণ্যবাহী জাহাজের জন্য। হরমুজ প্রণালীর বিশাল কর্মযজ্ঞ সামলানো তার চেয়ে বহুগুণ কঠিন হবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন নৌবাহিনীকে সমুদ্রপথে এত দীর্ঘস্থায়ী এবং তীব্র লড়াইয়ের মুখোমুখি হতে হয়নি যা বর্তমানে তাদের করতে হচ্ছে।
সবশেষে একটি বড় পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে ওয়াশিংটনের নীতিতে। ট্রাম্প প্রশাসনের সাম্প্রতিক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইরান যদি সরাসরি মার্কিন বা ইসরায়েলি জাহাজে হামলা না করে, তবে যুদ্ধবিরতি বিপন্ন হবে না। এই অবস্থানটি মূলত সমুদ্রপথের সার্বজনীন স্বাধীনতার যে চিরাচরিত মার্কিন দাবি, তা থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দেয়। ফলে আন্তর্জাতিক জাহাজ মালিকরা এখন এক বড় অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে আছেন। একদিকে ইরানের ছোট বোটের হুমকি, অন্যদিকে মার্কিন নীতির দোটানা; সব মিলিয়ে হরমুজ প্রণালী এখন বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মোড়ে পরিণত হয়েছে।
এপির বিশ্লেষণ

