একটু ভাবুন তো। পৃথিবীর মাত্র ৬০ হাজার মানুষের হাতে এত সম্পদ, যা কিনা বিশ্বের সব দরিদ্র মানুষের মোট সম্পদের তিন গুণেরও বেশি। এই চিত্রটা আরও বদলাবে আগামী পাঁচ বছরে। রিয়েল এস্টেট পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নাইট ফ্র্যাঙ্কের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ বলছে, ২০৩১ সালের মধ্যে বিশ্বে বিলিয়নিয়ারের সংখ্যা গিয়ে দাঁড়াবে প্রায় ৪ হাজারে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান এই তথ্য প্রকাশ করেছে।
বর্তমানে বিশ্বে বিলিয়নিয়ারের সংখ্যা ৩ হাজার ১১০ জন। আগামী পাঁচ বছরে এই সংখ্যা ২৫ শতাংশ বেড়ে ৩ হাজার ৯১৫ জনে পৌঁছাবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। শুধু বিলিয়নিয়ার নয়, মাল্টি-মিলিয়নেয়ারের সংখ্যাও বাড়ছে চোখে পড়ার মতো। অন্তত ৩০ মিলিয়ন ডলারের সম্পদ আছে, এমন মানুষের সংখ্যা ২০২১ সালে ছিল ১ লাখ ৬২ হাজার ১৯১ জন। এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ১৩ হাজার ৬২৬ জনে। অর্থাৎ, পাঁচ বছরেরও কম সময়ে বৃদ্ধি পেয়েছে ৩০০ শতাংশেরও বেশি।
প্রযুক্তি ও এআই যেভাবে সুপারচার্জ করছে বিলিয়নিয়ারদের সম্পদ
নাইট ফ্র্যাঙ্কের গবেষণা প্রধান লিয়াম বেইলি বলছেন, প্রযুক্তি জগত, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই, বিলিয়নিয়ার ও মিলিয়নিয়ারদের সম্পদ বৃদ্ধিকে একেবারে ‘সুপারচার্জ’ করে দিয়েছে। তাঁর কথায়, ব্যবসা বড় করার সক্ষমতা আগে কখনো এতটা ছিল না। প্রযুক্তি ও এআইয়ের প্রভাবে খুব দ্রুত বিশাল সম্পদ গড়ে তোলা এখন অনেক বেশি সহজ হয়ে গেছে।
সৌদি আরব থেকে সুইডেন, কোন দেশে সবচেয়ে দ্রুত বাড়ছে বিলিয়নিয়ার
এই প্রবণতায় কিছু দেশ ছুটছে বাকিদের চেয়ে অনেক দ্রুত। তেলসমৃদ্ধ সৌদি আরবে বিলিয়নিয়ারের সংখ্যা সবচেয়ে দ্রুত বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ২০২৬ সালে যেখানে বিলিয়নিয়ার আছেন ২৩ জন, ২০৩১ সালে সেই সংখ্যা পৌঁছাবে ৬৫ জনে, অর্থাৎ দ্বিগুণেরও বেশি। একই সময়ে পোল্যান্ডে এই সংখ্যা ১৩ থেকে বেড়ে ২৯ জনে এবং সুইডেনে ৩২ থেকে ৫৮ জনে পৌঁছাবে, যা ৮১ শতাংশ বৃদ্ধি।
বৈষম্যের ফাঁক বাড়ছে, চাপে পড়ছেন বিশ্বনেতারা
কিন্তু এই সমৃদ্ধির অন্য পিঠে বৈষম্যের ছবিটা ক্রমেই ভয়াবহ হচ্ছে। গত বছর প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড ইনইকুয়ালিটি রিপোর্ট দেখিয়েছে, বিশ্বের মাত্র ৬০ হাজারেরও কম মানুষ, যা মোট জনসংখ্যার দশমিক ০০১ শতাংশ, তারা মানবজাতির মোট দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সম্পদের তিন গুণেরও বেশি নিয়ন্ত্রণ করছেন।
এই বাস্তবতা থেকেই বিশ্বনেতাদের ওপর চাপ বাড়ছে, যেন অতিধনীদের ওপর কর বাড়ানো হয়। কারণ, উদ্বেগ আছে যে ধনীরা শুধু অর্থই নয়, রাজনৈতিক প্রভাবও কিনে নিচ্ছেন। দাতব্য সংস্থা অক্সফাম জানিয়েছে, গত বছর রেকর্ডসংখ্যক নতুন বিলিয়নিয়ার তৈরি হয়েছে, যা মোট সংখ্যা প্রথমবারের মতো ৩ হাজার ছাড়িয়ে দিয়েছে। তাদের হিসাব অনুযায়ী, বিলিয়নিয়ারদের সম্মিলিত সম্পদ ১৮ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার।
ফোর্বসের ধনী তালিকা অনুযায়ী, বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি এখন ইলন মাস্ক, যার সম্পদের পরিমাণ ৭৮৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। দ্বিতীয় স্থানে আছেন ল্যারি পেজ, যার সম্পদ ২৭২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার এবং তৃতীয় স্থানে জেফ বেজোস, যার সম্পদ ২৫৯ বিলিয়ন ডলার।
২০৩১ সালে বিলিয়নিয়ারের রাজধানী হবে এশিয়া প্যাসিফিক
নাইট ফ্র্যাঙ্কের গবেষণা প্রধান লিয়াম বেইলি আরও বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতা, কর সংস্কার এবং কঠোর নিয়ন্ত্রণের কারণে অতিধনীরা এখন এমন শহরে কেন্দ্রীভূত হচ্ছেন, যেখানে সুযোগ আর স্থিতিশীলতা দুটোই মেলে। নাইট ফ্র্যাঙ্কের প্রাইভেট অফিস বিভাগের চেয়ারম্যান ররি পেন বলেন, এক জটিল বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিবেশেও সম্পদ সৃষ্টি বাড়ছে। অতিধনীরা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি গতিশীল, কিন্তু যেখানে নিশ্চিন্তে বিনিয়োগ করা যায় বা পরিবার নিয়ে বসবাস করা যায়, এমন বাজারের সংখ্যা কমে এসেছে।
বর্তমানে বৈশ্বিক বিলিয়নিয়ারদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বসবাস করেন উত্তর আমেরিকায়। তবে পূর্বাভাস বলছে, ২০৩১ সালের মধ্যে এই অবস্থান হারিয়ে এগিয়ে যাবে এশিয়া প্যাসিফিক। তখন এই অঞ্চলের বিলিয়নিয়াররা মোটের ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ দখল করবেন, যেখানে উত্তর আমেরিকার অংশ নেমে আসবে ২৭ দশমিক ৮ শতাংশে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

