হুমকিতে পোলট্রি-মৎস্য খাত

0
হুমকিতে পোলট্রি-মৎস্য খাত

দেশের জ্বালানিসংকট বৃদ্ধির কারণে বহুমুখী প্রভাব পড়তে শুরু করেছে পোলট্রি ও মৎস্য খাতে। খামার পরিচালনা থেকে শুরু করে খাদ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ ও পরিবহন সবখানেই জ্বালানিনির্ভরতা থাকায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং খরচ বেড়ে যাচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দ্রুত সমাধান না হলে এই খাতগুলোতে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়।

খামার পরিচালনায় বাড়ছে ব্যয়: 

পোলট্রি ও প্রাণিসম্পদ খামারগুলোতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ব্যবহার অপরিহার্য। বিশেষ করে মুরগির খামারে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, আলো, পানির সরবরাহ ও ভেন্টিলেশন বজায় রাখতে সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়। বিদ্যুৎসংকটে অনেক খামারি ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভর করছেন। এতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ।

গাজীপুরের এক পোলট্রি খামারি রফিকুল ইসলাম জানান, আগে যেখানে প্রতি ব্যাচ মুরগি উৎপাদনে খরচ হতো দুই লাখ টাকা, এখন তা আরো ৫০ হাজার বেড়েছে। পর্যাপ্ত ফ্যান ও কুলিং সিস্টেম না চলায় হিট স্ট্রোকে মুরগি মারা যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। 

ধামরাইয়ের নুরুল ইসলামের রয়েছে দুটি খামার। এর মধ্যে একটি খামারের জেনারেটর চলে ডিজেলে আর অন্যটি পেট্রল-অকটেনে। সম্প্রতি জ্বালানিসংকট থাকায় জেনারেটর চালাতে পারেননি। তাই সময়মতো পানি সরবরাহ করতে না পারায় মারা গেছে ১১৫টি মুরগি।

খাদ্য উৎপাদনে প্রভাব: 

পোলট্রি ও মাছের খাদ্য উৎপাদন শিল্পও জ্বালানিসংকটে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক কারখানায় উৎপাদন কমিয়ে দিতে হচ্ছে।

ফিড প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় বাজারে খাদ্যের সরবরাহ কমছে এবং দাম বাড়ছে। এতে করে খামারিদের খরচও বাড়ছে, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর চাপ তৈরি করছে।

বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের প্রচার সম্পাদক শফিকুল ইসলাম বলেন, ফিড মিল পরিচালনা, খামারে জেনারেটর চালানো ও বাচ্চা মুরগির জন্য প্রয়োজনীয় তাপমাত্রা বজায় রাখতে নিয়মিত জ্বালানি দরকার হয়। কিন্তু লোডশেডিংয়ের সময় জেনারেটর চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি না পাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এতে করে ব্রয়লার মুরগির মৃত্যুঝুঁকিও বেড়ে যাচ্ছে।

অ্যাসোসিয়েশনের এই নেতা আরো বলেন, ফিড উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় ভুট্টার দেশীয় উৎপাদন মাত্র তিন থেকে চার মাসের চাহিদা মেটাতে পারে; বাকি কাঁচামাল আর্জেন্টিনা ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করতে হয়। এসব কার্যক্রমও বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

পোলট্রি খাতের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে ভ্যাকসিন আমদানি। ভ্যাকসিন আনতে হয় বিশেষ করে ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে। কিন্তু বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে আন্তর্জাতিক পরিবহন ব্যয় বেড়ে গেছে। ফলে উৎপাদন ব্যয় আরো বেড়ে যাচ্ছে।

পরিবহন ও সংরক্ষণে সংকট: 

পোলট্রি সেক্টরের  শফিকুল ইসলাম আরো বলেন, আগে যেখানে একটি ট্রাকে পোলট্রি পরিবহনে খরচ হতো প্রায় ১৩ হাজার টাকা, বর্তমানে তা ২০ হাজার টাকা। দূরপাল্লার ক্ষেত্রে পরিবহন খরচ ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ বেড়েছে। এমনকি জ্বালানি অনিশ্চয়তার কারণে অনেক পরিবহনকারী দূরপথে যেতে অনাগ্রহী। ফলে পুরো সাপ্লাই চেইন কার্যত ব্যাহত হচ্ছে।

সাভার উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ শওকত আলী জানান, জ্বালানিসংকটের কারণে মূলত ডিম ও মুরগি পরিবহনে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে জেনারেটরের ওপর নির্ভর করে খামার পরিচালনা অসম্ভব। তিনি খামারিদের পরামর্শ দিয়ে বলেন, লোডশেডিংয়ের সময় খামারের পর্দা তুলে রেখে প্রাকৃতিকভাবে বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা করা উচিত, যাতে ভেতরের তাপমাত্রা কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।

মাছ ধরায় ব্যাহত কার্যক্রম:

সমুদ্রে মাছ ধরার ট্রলারগুলো ডিজেলনির্ভর হওয়ায় জ্বালানির অভাব বা মূল্যবৃদ্ধি তাদের কার্যক্রম সীমিত করে দিচ্ছে। অনেক ট্রলার মালিক জানিয়েছেন, আগের মতো নিয়মিত সমুদ্রে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। একটি ট্রলারে লাগে পাঁচ থেকে ছয় হাজার লিটার জ্বালানি তেল।  কিন্তু ডিজেলসংকটের কারণে পটুয়াখালীর মহিপুর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে জেলেরা গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যেতে পারছেন না। ফলে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই মৎস্য বন্দরে নেমে এসেছে স্থবিরতা।

বিশেষজ্ঞদের মতামত: 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই খাতগুলো দেশের প্রোটিনের প্রধান উৎস হওয়ায় মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের পুষ্টি নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য প্রাণিজ আমিষ গ্রহণ আরো কঠিন হয়ে উঠবে।

জ্বালানিসংকট যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি বাজারে অস্থিরতা বাড়বে এবং খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে। এখনই সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠতে পারে। সৌজন্যে: কালের কণ্ঠ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here