একজন ফুটবলারের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন বিশ্বকাপ জেতা এই কথা অনেকবারই শোনা গেছে। সেই স্বপ্ন পূরণে লিওনেল মেসিকে অপেক্ষা করতে হয়েছে দীর্ঘ সময়। জার্মানি, দক্ষিণ আফ্রিকা, ব্রাজিল ও রাশিয়ায় ব্যর্থ হওয়ার পর অবশেষে ২০২২ সালে কাতারে বিশ্বকাপ জিতে সেই অপূর্ণতা ঘোচান তিনি। অন্যদিকে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো এখনো সেই শিরোপার খোঁজে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।
কিন্তু এই জায়গায় ব্যতিক্রম কিলিয়ান এমবাপ্পে। মাত্র ১৯ বছর বয়সেই ২০১৮ সালে বিশ্বকাপ জিতে ফেলেছিলেন তিনি। তখন অনেকেই মনে করেছিলেন, সবচেয়ে কঠিন কাজটি আগেই সেরে ফেলেছেন এই ফরাসি তারকা। এখন শুধু বাকি ইউরোপ সেরা ক্লাব প্রতিযোগিতার শিরোপা জেতা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই শিরোপাই যেন হয়ে উঠেছে তাঁর কাছে ‘সোনার হরিণ’।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৬ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ৩টি ক্লাবে ৯ জন কোচের অধীনে ১০ বার চেষ্টা করেও ইউরোপ সেরা এই শিরোপা জিততে পারেননি এমবাপ্পে। ৯৮টি ম্যাচে ৭০ গোল করেও অধরাই রয়ে গেছে কাঙ্ক্ষিত ট্রফি।
মোনাকোর জার্সিতে তাঁর এই প্রতিযোগিতায় অভিষেক। এরপর ২০১৭ সালে প্যারিস সাঁ জার্মাঁ-এ যোগ দিয়ে দীর্ঘ সাত মৌসুম খেলেছেন। এই সময়ে উনাই এমেরি, টমাস টুখেল, মরিসিও পচেত্তিনো, ক্রিস্টফ গালতিয়ের ও লুইস এনরিকের মতো একাধিক কোচের অধীনে খেলেও সাফল্য আসেনি।
পরে বড় স্বপ্ন নিয়ে যোগ দেন রিয়াল মাদ্রিদ-এ। ইউরোপ সেরা এই ক্লাবটির দখলে রয়েছে রেকর্ডসংখ্যক ১৫টি শিরোপা। ফলে অনেকেই ভেবেছিলেন, এখানে এসে খুব দ্রুতই শিরোপা জিতবেন এমবাপ্পে। কিন্তু বাস্তবতা হয়েছে উল্টো। তাঁর যোগদানের পর দুবারই কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় নিয়েছে দলটি।
আরও বিস্ময়কর বিষয়, এমবাপ্পে রিয়ালে যোগ দেওয়ার পরই প্যারিস সাঁ জার্মাঁ প্রথমবারের মতো এই শিরোপা জিতে ইতিহাস গড়ে। অথচ রিয়ালে দুই মৌসুম পার করেও শূন্য হাতে থাকতে হয়েছে তাঁকে।
রিয়ালে এখন পর্যন্ত তিন কোচ কার্লো আনচেলত্তি, জাবি আলোনসো ও আলভারো আরবেলোয়ার অধীনে খেলেছেন এমবাপ্পে। তবে সাম্প্রতিক ব্যর্থতার পর নতুন মৌসুমে আবার কোচ পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ তাঁর ১১তম অভিযানে আবার নতুন কোচের অধীনে নামতে হতে পারে।
চ্যাম্পিয়নস লিগে এমবাপ্পের সেরা সাফল্য আসে ২০২০ সালে, যখন তাঁর দল ফাইনালে উঠেছিল। কিন্তু সেই ম্যাচে বায়ার্ন মিউনিখ-এর কাছে হেরে স্বপ্নভঙ্গ হয়। এরপর আরও কয়েকবার সেমিফাইনালে উঠলেও শিরোপা ধরা দেয়নি।
ইতিহাসে এমন অনেক কিংবদন্তি আছেন, যারা অসাধারণ ক্যারিয়ার গড়েও এই শিরোপা জিততে পারেননি—রোনালদো (নাজারিও), জিয়ানলুইজি বুফন, জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচ, রুদ ফন নিস্টলরয়, ফ্রান্সিসকো টট্টি, রোমারিও, লোথার ম্যাথাউস কিংবা পাভেল নেদভেদের মতো তারকারা সেই তালিকায় রয়েছেন। এমবাপ্পেও কি সেই তালিকায় যোগ দেবেন—এমন প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
তবে এখনো বয়স মাত্র ২৭। সামনে দীর্ঘ পথ পড়ে আছে। তাই হাল ছাড়তে রাজি নন এই ফরাসি তারকা। সর্বশেষ বিদায়ের পর সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া বার্তায় তিনি বলেন, তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন, কিন্তু তা যথেষ্ট ছিল না। এই হতাশা কাটিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়ে তিনি প্রতিশ্রুতি দেন—দল খুব শিগগিরই আবার জয়ের ধারায় ফিরবে।
সব মিলিয়ে বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ আগেই পাওয়া এমবাপ্পের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে ইউরোপ সেরা ক্লাব শিরোপা জয়। তাঁর প্রতিভা ও সময়—দুটিই এখনো তাঁর পক্ষে। দেখার বিষয়, শেষ পর্যন্ত এই ‘সোনার হরিণ’ ধরা দেয় কি না।

