নিয়োগ বাণিজ্যে লাগাম টানতেই চক্রের নিশানায় সাবেক এমডি

0
নিয়োগ বাণিজ্যে লাগাম টানতেই চক্রের নিশানায় সাবেক এমডি

পল্লী দারিদ্র্য বিমোচন ফাউন্ডেশনে (পিডিবিএফ) স্বচ্ছতা ফেরাতে সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছিলেন ভারপ্রাপ্ত এমডি মো. মাহমুদুল হাসান। কিন্তু সেই উদ্যোগে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে দুর্নীতিতে জড়িত একটি শক্তিশালী চক্র। নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় তারা নাশকতা ও ষড়যন্ত্রের পথ বেছে নেয়—এমন প্রমাণ মিলেছে পুলিশের সিটি স্পেশাল ব্রাঞ্চের (সিটিএসবি) তদন্ত প্রতিবেদনে।

গত ৫ এপ্রিল পুলিশের সিটিএসবির ডিআইজির কাছে এ বিষয়ে একটি অনুসন্ধান প্রতিবেদন দাখিল করেন সহকারী পুলিশ সুপার কাজী মাহাবুবর রহমান। প্রতিবেদনে বলা হয়, পিডিবিএফে নিয়োগ ও পদোন্নতি বাণিজ্যে একটি শক্তিশালী চক্র দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে। নতুন এমডির সংস্কার কর্মকাণ্ডে তাদের দুর্নীতির পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নিজেদের স্বার্থ ঠিক রাখতে বিভিন্ন ষড়যন্ত্র ও নাশকতা সৃষ্টি করেছেন। 

সিটিএসবির অনুসন্ধানে ওই অনিয়ম ও নাশকতায় জড়িত কয়েকজনের নামও উঠে আসে। এদের মধ্যে বেশির ভাগই বর্তমানে পিডিবিএফে কর্মরত। তারা হলেন সাবেক ভারপ্রাপ্ত এমডি ও পিডিবিএফের বঙ্গবন্ধু পরিষদের সভাপতি মো. আমিনুল ইসলাম সহকারী দারিদ্র্য বিমোচন কর্মকর্তা মো. বজলুর রশিদ, ভারপ্রাপ্ত উপ-পরিচালক মো. হেলাল উদ্দিন আহমেদ, উপ-পরিচালক আবদুল মালেক, ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক মো. আব্দুল বাছেদ, ও সিনিয়র মাঠ কর্মকর্তা গণেশ চন্দ্র সরকার। বজলুর রশিদ ও গণেশ চন্দ্র সরকারকে নাশকতায় ইন্ধনদাতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। 

জানা গেছে, ২০২৪ সালের নভেম্বর পিডিবিএফের পরিচালক হিসেবে ২২তম বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের কর্মকর্তা ও যুগ্ম সচিব মো. মাহমুদ হাসানকে প্রেষণে নিয়োগ দেয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। পরে তাঁকে এমডির দায়িত্ব দেওয়া হয়। দায়িত্ব গ্রহণের পর নিয়োগ ও পদোন্নতিতে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে তিনি কিছু ব্যতিক্রমী উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এর ফলে দুর্নীতিবাজ চক্রের চক্ষুশূলে পরিণত হয়ে পড়েন। 

বর্তমানে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক পদে কর্মরত মাহমুদ হাসান জানান, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় পিডিবিএফে ব্যাপক নৈরাজ্য দেখা দিয়েছিল। সেই কঠিন পরিস্থিতিতে দায়িত্ব নিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা ও আনুগত্য প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। বিশেষ করে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় এক হাজার ৬৬৫ জনকে নিয়োগ এবং এক হাজার ৫২ জনকে পদোন্নতি দেওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে সিবিএ নামধারী একটি দুর্নীতিবাজ চক্র।

এরপর থেকে এমডিকে দায়িত্ব থেকে অবসারণে চলে নানা ষড়যন্ত্র। নামে-বেনামে বিভিন্ন অভিযোগ দাখিল করা হয়। 
এরই অংশ হিসেবে গত বছরের ১৭ নভেম্বর ভোর সাড়ে ৪টার দিকে রূপনগরে পিডিবিএফের সদর দপ্তরের গ্যারাজে পেট্রল বোমা হামলার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় গত বছরের ২০ নভেম্বর প্রতিষ্ঠানের তরফে মামলা হয়। অবশেষে গত ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের ডামাডোলের মধ্যে তাঁকে পিডিবিএফ থেকে অপসারণ করা হয় বলে জানা গেছে। তবে নাশকতার ঘটনায় অনুসন্ধানের জন্য সহকারী পুলিশ সুপার মাহাবুবর রহমানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। 

অনুসন্ধান প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পালাবদলের পর ভারপ্রাপ্ত এমডি মো. মাহমুদ হাসান দায়িত্ব নিয়েই প্রশাসনে বেশ কিছু সংস্কার আনেন। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির (এমআইএসটি) মাধ্যমে সহস্রাধিক কর্মী নিয়োগের উদ্যোগ নেন তিনি। তাতে ক্ষুব্ধ হয় ওই চক্রটি। তাদের দীর্ঘদিনের নিয়োগ-বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত হওয়ায় নাশকতার ছক আঁটতে থাকে। 

সিটিএসবির প্রতিবেদনে স্থানীয় পুলিশের গাফিলতির তথ্যও উঠে এসেছে। পিডিবিএফ কর্তৃপক্ষ থানায় প্রাথমিক অভিযোগ দেয় ও সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে। কিন্তু সিটিএসবির তদন্তে ধরা পড়ে, রূপনগর থানার তৎকালীন ওসি (বর্তমানে উত্তরা পূর্ব থানায় একই দায়িত্বে) মো. মোর্শেদ আলম এবং মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই অপূর্ব চন্দ্র সরকার দায়িত্ব পালনে গাফিলতি করেছেন। 

দারিদ্র্য বিমোচনই পিডিবিএফের মূল লক্ষ্য। তাই প্রতিষ্ঠানটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ও সুরক্ষা দিতে চিহ্নিত এসব ষড়যন্ত্রকারী ও উসকানিদাতাদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে কঠোর বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেছে সিটিএসবি। প্রতিবেদনে বলা হয়, ফৌজদারি অপরাধ ও সাইবার অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের প্রমাণ সংগ্রহ সাপেক্ষে আইনে সোপর্দ করে বিচারের মুখোমুখি করা যেতে পারে।  

এ বিষয়ে মাহমুদ হাসান বলেন, ‘পিডিবিএফের ২৬ বছরের ইতিহাসে আমিই প্রথম ব্যক্তি, যিনি যুগ্ম সচিব হিসেবে ওই দায়িত্ব পেয়েছিলেন। এই প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি ও নিয়োগ বাণিজ্যের ইতিহাস অনেক পুরোনো। ফলে দায়িত্ব পেয়েই আমি সবার আগে ওই চক্রটিকে গুটিয়ে দেওয়ার পদক্ষেপ নিই। আমার শক্ত পদক্ষেপের কারণে চক্রটির নিয়োগ বাণিজ্য হাতছাড়া হয়ে যায়।’ 

প্রশাসনের একজন সাবেক কর্মকর্তা বলেন, ন্যায় ও সত্যের পক্ষে নিরন্তর লড়াই চালিয়ে যাওয়া এমন কর্মকর্তাদের উপযুক্ত মূল্যায়ন না করাটা হতাশাজনক। দেশের স্বার্থেই সরকারি প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতিবাজ চক্রকে শাস্তির আওতায় আনার পাশাপাশি সৎ কর্মকর্তাদের পুরস্কৃত করা উচিত। অন্যথায় নিষ্ঠাবান কর্মকর্তারা নিরুৎসাহিত হয়ে পড়তে পারেন।

সূত্র : কালের কণ্ঠ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here