গত এক দশকে দেশে অর্থনৈতিক ইউনিট বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়লেও অর্থনীতির ভিত এখনো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ওপরই নির্ভরশীল। প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিনিয়োগ কমার পাশাপাশি বিদেশি ও যৌথ মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থান কমার প্রবণতাও সামনে এসেছে। অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৪-এর চূড়ান্ত ফলাফলে উঠে এসেছে এই চিত্র।
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) অডিটরিয়ামে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।
এতে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি। সভাপতিত্ব করেন বিবিএসের মহাপরিচালক মো. ফরহাদ সিদ্দিক। অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব আলেয়া আক্তার, পরিকল্পনা বিভাগের সচিব এস এম শাকিল আখতারসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৪ অনুযায়ী, ২০১৩ সালে দেশে বিদেশি ও যৌথ মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল এক হাজার ৬৪৪, যা ২০২৪ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৮৩৩।
অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানের সংখ্যায় সামান্য বৃদ্ধি (প্রায় ১১.৫ শতাংশ বৃদ্ধি) দেখা গেলেও কর্মসংস্থানের দিক থেকে দেখা যায়, ২০১৩ সালে বিদেশি ও যৌথ মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিল সাত লাখ ১৯ হাজার ৩৮৪ জন, যা ২০২৪ সালে কমে দাঁড়িয়েছে পাঁচ লাখ ৪২ হাজার ৭০১ জনে। অর্থাৎ এক দশকে এই খাতে কর্মসংস্থান কমেছে প্রায় এক লাখ ৭৬ হাজার ৬৮৩ জন, যা শতাংশের হিসাবে প্রায় ২৪.৫ শতাংশ হ্রাস।
এদিকে ১১ বছরে প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিনিয়োগ কমেছে ৮৮ শতাংশ। ২০১৩ সালে যেখানে দেশে প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিনিয়োগ ছিল এক হাজার ৯৪২টি প্রতিষ্ঠানে; ২০২৪ সালে প্রাবসী বাংলাদেশিদের বিনিয়োগকৃত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমে ২২২টিতে নেমেছে। কর্মসংস্থান ১১ হাজার ৩৯৫ থেকে চার হাজার ১৪৮ জনে নেমেছে।
অর্থনৈতিক শুমারি অনুযায়ী, ২০১৩ সালে দেশে অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা ছিল ৭৮ লাখ ১৮ হাজার ৫৬৫, যা ২০২৪ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক কোটি ১৭ লাখ দুই হাজার ৭৯২। অর্থাৎ এক দশকে ইউনিট বেড়েছে ৩৮ লাখ ৮৪ হাজার ২২৭টি বা প্রায় ৫০ শতাংশ। তবে এই প্রবৃদ্ধির মধ্যেও ৮৬ শতাংশ উদ্যোক্তা জানিয়েছেন, ব্যবসা পরিচালনায় তাঁদের অন্যতম প্রধান সমস্যা মূলধনের অভাব। অর্থনৈতিক ইউনিট বৃদ্ধির পাশাপাশি কর্মসংস্থানও বেড়েছে।
বর্তমানে এসব ইউনিটে কর্মরত মানুষের সংখ্যা তিন কোটি ছয় লাখ ৩২ হাজার ৬৬১, যা ২০১৩ সালের দুই কোটি ৪৫ লাখ ৮৫০ জনের তুলনায় ২৫.০৩ শতাংশ বেশি। কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে পুরুষের অংশগ্রহণ ৮৩.২৮ শতাংশ, নারীর ১৬.৭১ শতাংশ এবং তৃতীয় লিঙ্গের অংশগ্রহণ ০.০১ শতাংশ।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশের অর্থনীতির বড় ভিত্তি গড়ে তুলেছে ক্ষুদ্র ও কুটির খাত। মোট অর্থনৈতিক ইউনিটের মধ্যে ক্ষুদ্র শিল্প রয়েছে ৬৬ লাখ ৩১ হাজার ৪৮২টি (৫৬.৬৭ শতাংশ) এবং কুটির শিল্প ৪৫ লাখ ৩৩ হাজার ৫৮৯টি (৩৮.৭৪ শতাংশ)। অন্যদিকে মাঝারি শিল্পের সংখ্যা মাত্র ৩৬ হাজার ১১২ (০.৩১ শতাংশ) এবং বৃহৎ শিল্প ৯ হাজার ২৮৬টি (০.০৮ শতাংশ)। অর্থাৎ সংখ্যার দিক থেকে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারাই দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশের ৯০.০২ শতাংশ অর্থনৈতিক ইউনিটই সেবা খাতের অন্তর্ভুক্ত, যার সংখ্যা এক কোটি পাঁচ লাখ ৩৪ হাজার ৪৪৩। শিল্প খাতে ইউনিটের হার মাত্র ৯.৯৮ শতাংশ। ব্যবসার ধরন অনুযায়ী পাইকারি ও খুচরা ব্যবসা এবং মোটরযান মেরামত খাত এককভাবে সর্বোচ্চ ৪১.৮২ শতাংশ দখল করে আছে।
মালিকানার কাঠামো বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশের ৮৭.৩৬ শতাংশ স্থায়ী প্রতিষ্ঠান ব্যক্তিগত বা পারিবারিক মালিকানাধীন। প্রাইভেট লিমিটেড কম্পানি রয়েছে ১.৮২ শতাংশ এবং অংশীদারিভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ১.৪৪ শতাংশ। অন্যদিকে বিদেশি ও যৌথ মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা খুবই কম এবং এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থানেও হ্রাসের প্রবণতা লক্ষ করা গেছে, যা বিনিয়োগকাঠামোর একটি দুর্বল দিক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ভৌগোলিক দিক থেকে দেখা যায়, দেশের মোট অর্থনৈতিক ইউনিটের সর্বোচ্চ ২৭.৮ শতাংশ ঢাকা বিভাগে অবস্থিত। এরপর চট্টগ্রামে ১৭.৫১ শতাংশ এবং রাজশাহীতে ১৪.৩৬ শতাংশ। সবচেয়ে কম ইউনিট রয়েছে সিলেট বিভাগে, যেখানে হার ৪.৬৭ শতাংশ। এ ছাড়া খুলনায় ১২.৭৩ শতাংশ, রংপুরে ১১.৪১ শতাংশ, ময়মনসিংহে ৬.৬৩ শতাংশ এবং বরিশালে ৫.৬১ শতাংশ ইউনিট রয়েছে।
গ্রাম-শহরভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বর্তমানে পল্লী এলাকায় অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা ৭৩ লাখ ৮৫ হাজার ৮২৮ এবং শহরে ৪৩ লাখ ১৬ হাজার ৯৬৪। অর্থাৎ ইউনিটের দিক থেকে গ্রাম এগিয়ে থাকলেও কর্মসংস্থানে শহরের ভূমিকা দ্রুত বাড়ছে। অর্থনৈতিক ইউনিটের প্রকৃতি অনুযায়ী, মোট ইউনিটের ৫৩.৫৭ শতাংশ স্থায়ী প্রতিষ্ঠান, ৪.৯১ শতাংশ অস্থায়ী এবং ৪১.৫২ শতাংশ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডসম্পন্ন খানা।
অনুষ্ঠানে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহমান সাকি বলেন, অতীতে পরিসংখ্যানের ক্ষেত্রে একটি কৃত্রিম বাস্তবতা তৈরি করা হয়েছিল, যা দেশের প্রকৃত চিত্র আড়াল করেছিল। সেই অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে নির্ভরযোগ্য তথ্যভিত্তিক বাস্তবতা তুলে ধরা এখন জরুরি। তিনি বলেন, তথ্য অস্বস্তিকর হলেও তা গ্রহণ করতে হবে এবং সঠিক নীতিনির্ধারণে ব্যবহার করতে হবে।
তিনি আরো বলেন, অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা বাড়লেও দেশের ক্ষুুদ্র ও মাঝারি শিল্প বর্তমানে কঠিন অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এসব খাতকে সুরক্ষা ও সহায়তা দেওয়া সরকারের অগ্রাধিকার বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সৌজন্যে কালের কণ্ঠ

