পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালীতে মার্কিন ডলারের দীর্ঘদিনের একক আধিপত্য এবার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতিতে অস্থিরতা সৃষ্টি করলেও, এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে ওয়াশিংটনের আর্থিক আধিপত্য খর্ব করার নতুন এক কৌশলে হাত মিলিয়েছে ইরান ও চীন। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ডলারের একচ্ছত্র প্রভাবকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের যে অভিযোগ দীর্ঘদিনের, তার বিপরীতে এখন বিকল্প হিসেবে চীনা মুদ্রা ইউয়ানকে শক্তিশালী করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথের নিয়ন্ত্রণ কাজে লাগিয়ে ইরান এখন পণ্যবাহী জাহাজগুলোর কাছ থেকে ট্রানজিট ফি বা যাতায়াত শুল্ক সরাসরি চীনা ইউয়ানে আদায় করছে। লয়েডস লিস্টসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পর্যবেক্ষক সংস্থা নিশ্চিত করেছে, গত মার্চ মাসের শেষ নাগাদ বেশ কিছু বাণিজ্যিক জাহাজ ইতিমধ্যে চীনা মুদ্রায় তাদের পাওনা পরিশোধ করেছে। এই পদক্ষেপকে বৈশ্বিক তেল বাজারে বহুল আলোচিত ‘পেট্রোইউয়ান’ ব্যবস্থার দিকে একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইরান ও চীনের এই যৌথ প্রচেষ্টার পেছনে রয়েছে সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থ। দীর্ঘ সময় ধরে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কবলে থাকা ইরানের জন্য ডলারের লেনদেন অত্যন্ত জটিল এবং ঝুঁকিপূর্ণ। ইউয়ানে বাণিজ্য পরিচালনার মাধ্যমে তেহরান সরাসরি মার্কিন ব্যাংকিং ব্যবস্থা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। অন্যদিকে, চীনের লক্ষ্য হলো বিশ্ব অর্থনীতিতে একটি বহুমুখী বাণিজ্যের পরিবেশ তৈরি করা যেখানে ডলারের বিকল্প হিসেবে ইউয়ানের শক্ত অবস্থান নিশ্চিত হবে। বেইজিংয়ের দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা হলো তাদের মুদ্রাকে আন্তর্জাতিক রিজার্ভ কারেন্সি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ কেনেথ রোগফ এই পরিস্থিতিকে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর বড় ধরণের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, ইরান কেবল ওয়াশিংটনকে বিরক্ত করার জন্যই এটি করছে না বরং তারা মার্কিন নিষেধাজ্ঞা থেকে বাঁচতে এবং তাদের প্রধান মিত্র চীনের সাথে সম্পর্ক আরও মজবুত করতে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে ইউয়ানকে বেছে নিয়েছে। চীন বর্তমানে ইরানের ৮০ শতাংশেরও বেশি তেল ক্রয় করে। এই লেনদেনের বড় অংশই এখন ইউয়ানে সম্পন্ন হচ্ছে বলে ধারণা করা হয়।
তবে ডলারের এই বিশাল সাম্রাজ্য রাতারাতি ধসে পড়বে এমনটা ভাবার সুযোগ নেই বলে মনে করছেন অনেক বাজার বিশ্লেষক। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের অর্ধেকের বেশি অংশ জুড়ে রয়েছে মার্কিন ডলার, যেখানে ইউয়ানের অবস্থান মাত্র দুই শতাংশের কাছাকাছি। এছাড়া ইউয়ান এখনো পুরোপুরি রূপান্তরযোগ্য মুদ্রা হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি এবং বেইজিংয়ের কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কারণে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে এর গ্রহণযোগ্যতা ডলারের মতো স্বচ্ছ নয়। ফলে এই পরিবর্তনকে তাৎক্ষণিক কোনো বিপ্লব না বলে দীর্ঘমেয়াদী একটি ক্ষয় হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা।
ইউরোপীয় সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিটিক্যাল ইকোনমির পরিচালক হোসুক লি-মাকিয়ামা মনে করেন, চীনের একটি বিশেষ সুবিধা রয়েছে যা অতীতে ইউরোপ বা জাপানের ছিল না। চীন বর্তমানে বিশ্বের বৃহত্তম উৎপাদনকারী দেশ এবং ইরানের প্রয়োজনীয় প্রায় সব ধরণের যন্ত্রপাতি ও শিল্প পণ্য তারা সরবরাহ করতে সক্ষম। ফলে ইরান যদি ডলারের পরিবর্তে ইউয়ান ব্যবহার করে, তবে তারা সেই মুদ্রা দিয়ে সরাসরি চীনের বাজার থেকে তাদের প্রয়োজনীয় আমদানি কার্যক্রম সম্পন্ন করতে পারছে। এতে করে ডলারের ওপর তাদের নির্ভরতা অনেকাংশেই কমে এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালীতে ইউয়ানের এই ব্যবহার বৈশ্বিক ডি-ডলারাইজেশন বা ডলার বিমুখীকরণ প্রক্রিয়ায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। যদিও সৌদি আরবের মতো উপসাগরীয় দেশগুলো এখনো তাদের তেলের দাম ডলারে নির্ধারণ করছে, কিন্তু ইরান ও চীনের এই উদ্যোগ অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশগুলোকেও বিকল্প মুদ্রার কথা ভাবতে উৎসাহিত করছে। যদি এই প্রবণতা আরও ছড়িয়ে পড়ে, তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে তাদের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গাটি দুর্বল হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।
আল জাজিরার বিশ্লেষণ

