প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদফতরের (ডিজিএফআই) সাবেক মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদ ক্ষমতার অপব্যবহার করে প্রাকৃতিক জলাশয় ও নিরীহ মানুষের জমি এমনকি কবরস্থান দখল করে অবৈধভাবে গড়ে তোলা আসিয়ান সিটির বিশাল আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়নে ভয়ভীতি দেখিয়েছিলেন। সেই চাঞ্চল্যকার তথ্য জানিয়েছেন পরিবেশ অধিদফতরের সাবেক পরিচালক (এনফোর্সমেন্ট) মুহাম্মদ মুনীর চৌধুরী।
শনিবার নিজের ফেসবুক পেজে এ সংক্রান্ত পোস্ট দেন তিনি।
সেই পোস্টে মুনীর চৌধুরী লিখেছেন, ফেসবুকে আমি সরব নই। আজ এক সত্য প্রকাশ না করে পারলাম না। এ যেন বিবেকের দংশন! মামুন খালেদ ছিলেন এক সময়কার দোর্দণ্ড প্রতাপশালী সামরিক অফিসার। আমি ছিলাম পরিবেশ অধিদফতরের ডিরেক্টর (এনফোর্সমেন্ট)। বহু রাজনৈতিক নেতা, মন্ত্রী এবং প্রভাবশালীদের দখল থেকে উদ্ধার করছিলাম নদী, খাল, জলাশয়, পাহাড় ও বনভূমি। একদিকে মন্ত্রী ও প্রভাবশালীদের চাপ, আরেকদিকে কর্পোরেট শক্তিগুলোর হুমকি। ঢাকা বিমানবন্দরের অদূরে প্রায় ২৫০ একর প্রাকৃতিক জলাশয় ও নিরীহ মানুষের জমি এমনকি কবরস্থান দখল করে গড়ে উঠছে আসিয়ান সিটির বিশাল আবাসন প্রকল্প- পুরোটাই অবৈধ। প্রশাসন, রাজউক, পরিবেশ অধিদফতর, পুলিশ সবারই নীরবতা দেখে অসহায় মানুষের কান্না ও অভিশাপে আকাশ ভারী হয়ে আসছে। অজস্র অভিযোগ দেওয়া হয়েছিল রাজউক, পুলিশ, প্রশাসন ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে, কোনো প্রতিকার নেই। রাজউক চেয়ারম্যান আমাকে বললেন, মুনীর চৌধুরী আমি অসহায়।
তিনি লিখেছেন, অতঃপর সাহস করে অভিযানে নামলাম। অবৈধ প্রকল্পের যন্ত্রপাতি ও স্থাপনা জব্দ, অকেজো করে দিলাম। প্রকল্পের প্রধান প্রকৌশলীকে গ্রেফতার করলাম। ততক্ষণে পরিবেশমন্ত্রী ড. হাসান মাহমুদের চাপ, অবশেষে ডিজিএফআই প্রধান মামুন খালেদের হুমকি, চাপ ও রক্তচক্ষু। ঘটনাস্থলে পাঠালেন তার কর্নেল স্টাফকে। অভিযান বন্ধের নির্দেশ এলো। আমি কর্নেল স্টাফকে ফিরিয়ে দিলাম। অভিযান অব্যাহত রেখে পুরো প্রকল্পের কাজ বন্ধ করে আমার নিয়ন্ত্রণে আনলাম। ক্ষতিগ্রস্ত শত শত বাসিন্দাদের বললাম, কোনো ভয় নেই, আমি পাশে আছি। অবৈধ আবাসন হবে না। চাপ আরও ভয়ংকরভাবে আসলো। মন্ত্রী বললেন, মামুন খালেদ টাকার বস্তাসহ আপনাকে গ্রেফতার করে মিডিয়ায় রিপোর্ট করবেন। আপনি অভিযান বন্ধ করেন। ক্ষোভ ঝেড়ে প্রত্যুত্তরে বললাম, স্যার, আপনি সরকারের মন্ত্রী না? কেন ভয়?
তিনি আরও লিখেছেন, সেই কর্নেল স্টাফের বারবার অনুরোধ, আসিয়ানের মালিকের যেন কোনো ক্ষতি না হয়। আমার জবাব, পরিবেশ সুরক্ষা এবং দেশের স্বার্থ সবার ঊর্ধ্বে। এরপর আসিয়ানের মালিককে ৫০ লাখ টাকা জরিমানা করে, তাকে চাপ দিয়ে সেই জরিমানা আদায় করলাম। এতে পরিবেশমন্ত্রী এবং মামুন আরও ক্ষিপ্ত হলেন। আমার মন বলছে, কীসের মামুন খালেদ? কীসের ডিজিএফআইয়ের হুমকি? সর্বময় ক্ষমতা আল্লাহর। ওইদিন রাতে আরও ভয়ংকর ঘটনা। আমি পরিবেশ ভবনে রাতযাপন করতাম, ওই ভবন থেকে রাতে-দিনে সারা বাংলাদেশে অভিযানগুলো চালাতাম। আমার কোনো ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বলতে কিছুই ছিল না। যদিও ‘বেলা’ কিংবা পরিবেশবাদী কোনো সংগঠন সেই পরিস্থিতিতে আমার পাশে দাঁড়ায়নি। কোথায় আজ মামুন খালেদ?
পরিবেশ অধিদফতরের সাবেক পরিচালক (এনফোর্সমেন্ট) মুহাম্মদ মুনীর চৌধুরী লিখেছেন, সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্রের ক্ষমতা সীমা অতিক্রম করলে তা যে ফ্রাঙ্কেনস্টাইন হয়ে দাঁড়ায়, এটি তার অনন্য নজির। সরকারকে অনুরোধ জানাব, আবাসন প্রকল্প জলসিঁড়ি বাস্তবায়নে মামুন খালেদের দুর্নীতির ঘটনা উদ্ঘাটন করুন। রাষ্ট্রযন্ত্রের সর্বস্তরে পেশাদারিত্ব, সততা ও যোগ্যতাকে সম্মান ও মূল্যায়ন করুন।
এর আগে, ২৫ মার্চ রাতে ঢাকার মিরপুর এলাকা থেকে মামুন খালেদকে আটক করে (ডিবি)। তিনি ২০০৭-০৮ সালে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ডিজিএফআইয়ে বিভিন্ন পদে কর্মরত ছিলেন। সর্বশেষ কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর (সিআইবি) পরিচালক ছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পরও তিনি একই পদে ছিলেন। এরপর ২০১১ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত তিনি ডিজিএফআইয়ের মহাপরিচালক ছিলেন।

