আকাশচুম্বী ইরান যুদ্ধের ব্যয়, হাঁপাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র!

0
আকাশচুম্বী ইরান যুদ্ধের ব্যয়, হাঁপাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র!

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের শুরু করা সামরিক অভিযান তিন সপ্তাহে গড়িয়েছে। তবে শুরুর দিকে এই লড়াইকে ‘সীমিত’ রাখার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবে ওয়াশিংটনকে এখন বিশাল অংকের আর্থিক বোঝা সামলাতে হচ্ছে। পেন্টাগন থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান এই যুদ্ধের খরচ ২০০৩ সালের ইরাক আক্রমণের প্রাথমিক পর্যায়ের ব্যয়কেও ছাড়িয়ে গেছে। অথচ এই অভিযানে কোনো স্থলসেনা ব্যবহার করা হচ্ছে না। 

মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন ইতোমধ্যে কংগ্রেসের কাছে ২০০ বিলিয়ন ডলারের একটি জরুরি তহবিল চেয়েছে। এই বিশাল অংকের অর্থ ব্যয় করা হবে এযাবৎ চালানো হামলাগুলোর খরচ মেটাতে এবং ফুরিয়ে আসা অত্যাধুনিক অস্ত্রের মজুত পুনরায় গড়ে তুলতে। এর আগে ইরাক যুদ্ধের শুরুতে যে পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল, বর্তমান মুদ্রাস্ফীতির হার বিবেচনা করলেও এবারের চাহিদা তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। মূলত আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও স্মার্ট বোমার অত্যাধুনিক ব্যবহারের কারণেই সামরিক বাজেট এই উচ্চতায় পৌঁছেছে।

২০০৩ সালে যখন ইরাক যুদ্ধ শুরু হয়, তখন দেড় লাখের বেশি মার্কিন সেনা এবং বিশাল সাঁজোয়া বহর ওই অভিযানে সরাসরি যুক্ত ছিল। বর্তমান ইরান অভিযানে স্থলবাহিনীর কোনো পদচারণা নেই বললেই চলে, তবে পাল্টে গেছে যুদ্ধের ধরণ। উচ্চ-তীব্রতার আকাশ এবং নৌ-যুদ্ধ এখন অনেক বেশি ব্যয়বহুল হয়ে দাঁড়িয়েছে। দূরপাল্লার নিখুঁত নিশানার ক্ষেপণাস্ত্রগুলো এক একটি কয়েক মিলিয়ন ডলার মূল্যের। ফলে প্রথাগত স্থল অভিযানের চেয়ে এই প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধ অনেক দ্রুত নগদ অর্থ পুড়িয়ে ফেলছে।

মার্কিন সামরিক পরিকল্পনাবিদদের মতে, হামলার প্রচণ্ডতা এই বিপুল ব্যয়ের মূল কারণ। মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ইরানের অভ্যন্তরে সাত হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে। ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দেওয়ার জন্য অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা হয়েছে অত্যন্ত দামী ‘স্ট্যান্ড-অফ’ অস্ত্র। প্রতিটি টমাহক ক্রুজ মিসাইল নিক্ষেপ করতে খরচ হচ্ছে কোটি কোটি টাকা। প্রথম দফার বড় হামলার পর তুলনামূলক সস্তা গাইডেড বোমা ব্যবহার করা হলেও সেগুলোর সংখ্যা কয়েক হাজার হওয়ায় মোট খরচ আকাশচুম্বী হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অভিযানের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে মার্কিন কমান্ডররা তুলনামূলক কম খরচের যুদ্ধোপকরণ ব্যবহার শুরু করেছেন। আকাশসীমায় নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পর এই পরিবর্তন আনা হয় যাতে প্রতিদিনের খরচের হার কিছুটা কমানো যায়। তবে এতে সামগ্রিক আর্থিক চিত্রে খুব একটা বড় পরিবর্তন আসেনি। পেন্টাগনের প্রধান উদ্বেগের জায়গা হলো দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে তিল তিল করে জমানো উন্নত অস্ত্রের মজুত মাত্র কয়েক দিনের হামলায় প্রায় শেষ হয়ে গেছে। এখন এই ঘাটতি পূরণ করাটাই ওয়াশিংটনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

আর্থিক তুলনা বাদ দিলেও ইরাক ও ইরানের মধ্যে বড় ধরণের কৌশলগত পার্থক্য রয়েছে। ইরানের ভৌগোলিক অবস্থান, বন্ধুর ভূখণ্ড এবং ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সামরিক অবকাঠামোর কারণে সেখানে স্থল অভিযান চালানো রাজনৈতিক ও কৌশলগতভাবে অসম্ভব বলে মনে করেন প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা। এই বাস্তবতার কারণেই ওয়াশিংটনকে পুরোপুরি বিমান শক্তির ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। কিন্তু এই কৌশলের শুরুতেই যে বিশাল অংকের বিল সামনে এসেছে, তা মার্কিন প্রশাসনের হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিয়েছে।

ক্যাপিটাল হিলে এই নতুন তহবিল পাসের পথ খুব একটা মসৃণ হবে বলে মনে হচ্ছে না। ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধের সময় মার্কিন কংগ্রেসে যে ধরণের সর্বসম্মত সমর্থন ছিল, বর্তমানের বিভক্ত রাজনৈতিক পরিবেশে তা অনুপস্থিত। সাধারণ মানুষের মধ্যেও এই দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের প্রতি সমর্থন খুবই কম। তাছাড়া ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে যুদ্ধের উদ্দেশ্য নিয়ে বারবার ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা আসায় খোদ মিত্রদের মধ্যেও সংশয় তৈরি হয়েছে। যুদ্ধের লক্ষ্য কখনো পরমাণু কেন্দ্র, কখনো নৌ-সম্পদ আবার কখনো প্রক্সি নেটওয়ার্ক ধ্বংস করা বলে দাবি করা হচ্ছে।

সবমিলিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে এই ব্যয়বহুল আকাশযুদ্ধ এখন বাইডেন প্রশাসনের জন্য একটি বড় ধরণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মরণফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে ফুরিয়ে যাওয়া অস্ত্রের মজুত আর অন্যদিকে বিশাল অঙ্কের বাজেট ঘাটতি, এই দুই সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে ওয়াশিংটন কীভাবে তাদের পরবর্তী কৌশল নির্ধারণ করবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছে। যুদ্ধের ময়দান থেকে পাওয়া সংবাদের পাশাপাশি এখন সবার নজর মার্কিন কংগ্রেসের অর্থ বরাদ্দের সিদ্ধান্তের দিকে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here