ইসরায়েল ভেবেছিল ধ্বংস হয়ে গেছে হিজবুল্লাহ, বাস্তবে যা ঘটেছে

0
ইসরায়েল ভেবেছিল ধ্বংস হয়ে গেছে হিজবুল্লাহ, বাস্তবে যা ঘটেছে

এক বছরেরও বেশি সময় ধরে ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র এবং লেবাননের সরকার মনে করেছিল হিজবুল্লাহ চিরতরে ধ্বংস হয়ে গেছে। তবে লেবাননের এই সশস্ত্র গোষ্ঠী আবার ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িত হয়েছে এবং ইরান বনাম মার্কিন-ইসরায়েলি সংঘাতের প্রেক্ষিতে শত্রুর ওপর আঘাত চালাচ্ছে।

যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের পারফরম্যান্স এবং ইসরায়েলি ভূখণ্ডের গভীরে আঘাত হানার ক্ষমতা প্রমাণ করে, হিজবুল্লাহ ১৫ মাসের যুদ্ধবিরতিকে যুদ্ধের সমাপ্তি হিসেবে নয়, বরং পুনর্গঠন এবং পরবর্তী সংঘাতের প্রস্তুতির জন্য ব্যবহার করেছে।

গাজার যুদ্ধের পর ২০২৪ সালের ২৭ নভেম্বর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলে প্রকাশ্য আলোচনায় বলা হয়েছিল হিজবুল্লাহ ধ্বংস হয়ে গেছে। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছিলেন, তাদের অভিযান হিজবুল্লাহকে ‘কয়েক দশক’ পিছিয়ে দিয়েছে, রকেট ধ্বংস করেছে এবং শীর্ষ নেতৃত্বকে নির্মূল করেছে।

একজন ঊর্ধ্বতন মার্কিন কর্মকর্তা হিজবুল্লাহকে ‘অত্যন্ত দুর্বল’ এবং ‘বিধ্বস্ত’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। বৈরুতেও রাজনৈতিক সুর বদলেছে। প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন বলেছিলেন রাষ্ট্রের কাছে অস্ত্র রাখার একচেটিয়া অধিকার থাকা উচিত এবং প্রধানমন্ত্রী নওয়াফ সালাম বলেছিলেন লিতানি নদীর দক্ষিণে হিজবুল্লাহর সামরিক উপস্থিতি প্রায় শেষ হয়ে গেছে।

তৎকালীন বিশ্লেষকরা মনে করতেন, ইসরায়েলের হামলায় হিজবুল্লাহর সামরিক শক্তির ৮০ শতাংশ ধ্বংস হয়ে গেছে। তবে দেখা যাচ্ছে, সেই সময় বড় ক্ষতিকে ভুলভাবে হিজবুল্লাহর কৌশলগত পতন হিসেবে দেখা হয়েছিল।

হিজবুল্লাহ যুদ্ধবিরতির পরপরই পুনর্গঠন শুরু করে। তাদের ধারণা ছিল, যুদ্ধ শেষ হয়নি, বরং পরবর্তী লড়াই শুরু হওয়া সময়ের ব্যাপার। যুদ্ধবিরতি তাদের কাছে কোনো রাজনৈতিক নিষ্পত্তি নয়, বরং একটি কর্মক্ষম বিরতি ছিল, যার প্রতিটি দিন ছিল মূল্যবান।

হিজবুল্লাহ বিশ্বাস করেছিল ইসরায়েল তাদের ধ্বংস করতে ব্যর্থ হবে। প্রকাশ্য শত্রুতার বিরতি তাদের পুনর্গঠনের সুযোগ দিয়েছিল। তাদের লক্ষ্য ছিল ২০২৩ সালের অক্টোবরের আগের সামরিক সক্ষমতা, সাংগঠনিক কাঠামো এবং অবকাঠামো পুনরুদ্ধার করা।

২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সামরিক কমান্ডাররা জানান, যা যা পুনর্গঠন করা সম্ভব ছিল সব সম্পন্ন হয়েছে। কিছু সক্ষমতা, বিশেষ করে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সম্পূর্ণ পুনঃস্থাপন এখনও কঠিন।

হিজবুল্লাহর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ইসরায়েলের গোয়েন্দা অনুপ্রবেশ এবং প্রাথমিক কমান্ড কাঠামোর ধ্বংস। তবে তারা যোগাযোগ ব্যবস্থায় আদিম পদ্ধতি, যেমন হাতে লেখা বার্তা এবং বিচ্ছিন্ন ইউনিটের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবহার করে পুনর্গঠন করেছে।

২০০৬ সালের লেবানন যুদ্ধের পর হিজবুল্লাহ প্রথাগত সেনাবাহিনীর মতো গঠন তৈরি করেছিল। ২০২৪ সালের যুদ্ধের অভিজ্ঞতা বেঁচে থাকা কমান্ডারদেরকে পুনঃবিবেচনায় বাধ্য করেছে। তারা পুনরায় ‘মুগনিয়া চেতনা’ অনুসরণ করে স্বায়ত্তশাসিত ইউনিটের ওপর নির্ভর করে কাজ করছে।

দক্ষিণ লেবাননে প্রকাশ্যভাবে যুদ্ধবিরতির শর্ত থাকলেও হিজবুল্লাহ ধৈর্য, সতর্কতা এবং ছদ্মবেশ ব্যবহার করে নিজেদের অবস্থান পুনর্গঠন করেছে। পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠনের কাজটি দিনের পর দিন চলেছে, এবং শত্রু বুঝতে পারিনি তারা ধীরে ধীরে শক্তিশালী হচ্ছে।

রসদ সরবরাহের পথ বিচ্ছিন্ন হলেও হিজবুল্লাহ ইরানি সমর্থন ও স্থানীয় উৎপাদনের মাধ্যমে রকেট এবং ড্রোনের মজুদ পুনর্ভর করেছে। যুদ্ধক্ষেত্রে সাম্প্রতিক হামলায় তারা প্রমাণ করেছে, তারা এখনও শক্তিশালী এবং ইসরায়েলের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে সক্ষম।

হিজবুল্লাহর সাবেক মিডিয়া প্রধান মোহাম্মদ আফিফ বলেছিলেন, হিজবুল্লাহ কেবল একটি দল নয়, এটি একটি জাতি, এবং জাতির মৃত্যু হয় না। বাস্তবতায় তারা প্রমাণ করেছে, ধ্বংস ও ধাক্কা সত্ত্বেও সংগঠন আবার শক্তিশালীভাবে ফিরে এসেছে।

সূত্র: মিডল ইস্ট আই

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here