পরিবারের স্বপ্ন পূরণ করতে প্রবাসে পাড়ি দিয়েছিলেন,কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। নির্মম মিসাইল হামলায় জীবন থেমে গিয়ে শেষ পর্যন্ত কফিনবন্দি হয়ে বাড়ি ফিরলেন টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলার কীর্ত্তনখোলা গ্রামের প্রবাসী মোশাররফ হোসেন (৪০)।
শুক্রবার সকালে বিমানবন্দর থেকে মরদেহ গ্রহণ শেষে গ্রামের বাড়িতে আনা হলে মুহূর্তেই নেমে আসে এক হৃদয়বিদারক পরিবেশ। প্রিয় মানুষটিকে শেষবারের মতো দেখতে ভিড় করেন স্বজন, প্রতিবেশী ও এলাকাবাসী। কান্না আর আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পুরো এলাকা যেন একটি গ্রাম এ্কসাথে শোক পালন করছে।
অভাবের সংসারে একটু স্বস্তি ফেরাতে, প্রায় ৮ বছর আগে প্রবাস জীবন বেছে নিয়েছিলেন মোশাররফ। সৌদি আরবের আল খারিজ শহরের পাশে একটি প্রতিষ্ঠানে পরিচ্ছন্নতা কর্মী হিসেবে নিরলস পরিশ্রম করতেন। নিজের কষ্ট ভুলে প্রতিনিয়ত ভেবেছেন শুধু পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে। কিন্তু গত ৮ মার্চ, ইফতারের আগমুহূর্তে মিসাইল হামলায় নির্মমভাবে থেমে যায় তার জীবনসংগ্রাম।
বাবা মো. সূর্যত আলী ও মা জহুরা বেগম শোকে বাকরুদ্ধ। মায়ের আহাজারি থামছেই না বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন তিনি। স্ত্রী কবরী আক্তার যেন এখনো বিশ্বাস করতে পারছেন না যার সঙ্গে কিছুদিন আগেও স্বপ্নের কথা বলেছিলেন, সেই মানুষটি আজ নিথর হয়ে শুয়ে আছেন তার সামনে।
স্ত্রী জানান, ঘটনার আগের রাতেও স্বামীর সঙ্গে কথা হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, ‘ঈদের আগে টাকা পাঠাবো, ছেলেদের জন্য কিছু কিনো।’ সেই আশ্বাসই এখন পরিণত হয়েছে অসহ্য স্মৃতিতে যা মনে পড়লেই ভেঙে পড়ছেন তিনি।
দুই শিশু সন্তান মাহিম (নবম শ্রেণি) ও মিহান (প্রথম শ্রেণি) এখনো পুরো বাস্তবতা বুঝে উঠতে পারেনি। ছোট্ট মিহান কখনো বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে, কখনো আশেপাশের কান্না দেখে বিস্মিত হয়। হয়তো সে এখনো বিশ্বাস করছে, বাবা একটু পরেই উঠে দাঁড়াবেন।
তিন বছর আগে অল্প কিছু দিনের জন্য দেশে এসেছিলেন মোশাররফ। এরপর আবার ফিরে যান পরিবারের স্বপ্ন পূরণের পথে। কিন্তু সেই যাত্রা আর শেষ হলো না জীবনের আলো নিয়ে—শেষ হলো এক করুণ পরিণতিতে।
আজ বিকাল ৫টায় তার জানাজা নামাজ অনুষ্ঠিত হবে। জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফনের প্রস্তুতি চলছে।
স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিবারটিকে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কোনো সহায়তাই কি একজন প্রবাসী বাবার শূন্যতা পূরণ করতে পারে?
একজন মানুষের স্বপ্ন ছিল পরিবারের মুখে হাসি ফোটানো। কিন্তু নির্মম বাস্তবতায় সেই স্বপ্ন থেমে গেল মিসাইলের আঘাতে। রেখে গেলো ভেঙে যাওয়া একটি পরিবার, স্তব্ধ কিছু চোখ, আর না বলা অসংখ্য কষ্টের গল্প।

