এই রাজনৈতিক দার্শনিকের বিদায় ইরানকে ‌‘খুব’ ভোগাবে?

0
এই রাজনৈতিক দার্শনিকের বিদায় ইরানকে ‌‘খুব’ ভোগাবে?

ইরানের রাজনীতি, সামরিক কৌশল এবং দর্শনের জগতে অপূরণীয় শূন্যতা তৈরি করে বিদায় নিলেন আলী লারিজানি। ইসরায়েলি বিমান হামলায় ৬৭ বছর বয়সী এই প্রবীণ রাজনীতিবিদের মৃত্যু কেবল তেহরানের জন্য একজন অভিজ্ঞ অভিভাবককে হারানো নয় বরং দেশটির শাসনব্যবস্থার এক অনন্য সেতুবন্ধন বিচ্ছিন্ন হওয়া। লারিজানিকে পশ্চিমা বিশ্লেষকরা ইরানের ‘রেনেসাঁ ম্যান’ বা বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী হিসেবে অভিহিত করতেন। সামরিক বাহিনী থেকে শুরু করে আইনসভা এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গন, সবখানেই ছিল তার অবাধ বিচরণ।

লারিজানি কর্মজীবন ছিল বৈচিত্র্যময় এবং সাফল্যে মোড়ানো। তিনি একাধারে ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম আইআরআইবির প্রধান, পার্লামেন্ট স্পিকার এবং সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। গত বছরের আগস্টে তাকে আবারও নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, যা বর্তমান অস্থিতিশীল সময়ে তার অপরিহার্যতার প্রমাণ দেয়। ইরাকি বংশোদ্ভূত এই ইরানি নাগরিক আশির দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হিসেবেও লড়াকু ভূমিকা পালন করেছিলেন।

রাজনীতি এবং যুদ্ধের ময়দান ছাড়িয়ে লারিজানির বিচরণ ছিল দর্শনের গভীর তত্ত্বে। তিনি অন্তত ছয়টি দর্শনের বই লিখেছেন এবং ইমানুয়েল কান্টের বিজ্ঞান ও গণিত বিষয়ক দর্শনের ওপর বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তার এই বুদ্ধিবৃত্তিক গভীরতা তাকে অন্যান্য সাধারণ রাজনীতিবিদদের থেকে আলাদা করে তুলেছিল। সাংবাদিক বারবারা স্লাভিনের মতে, লারিজানি ছিলেন এমন একজন ব্যক্তি যার হাত একই সাথে সামরিক কৌশল এবং জাতীয় সংস্কৃতির নাড়ি টিপে ধরতে জানত।

ইরানের শাসনক্ষমতার কেন্দ্রে লারিজানির অবস্থান ছিল অত্যন্ত সুসংহত। তিনি এক প্রভাবশালী আলেম পরিবারে বড় হয়েছেন, যার এক ভাই বিচার বিভাগের প্রধান ছিলেন এবং অন্য ভাইয়েরাও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন। বিশ্লেষক সিনা তুসি মনে করেন, লারিজানি ছিলেন, বাস্তববাদী নেতা। তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক উপদলের মধ্যে সমন্বয় করতে পারতেন, যা সংকটের মুহূর্তে ইরানের জন্য অত্যন্ত জরুরি ছিল। তার মৃত্যুতে সেই মধ্যস্থতাকারী কণ্ঠস্বরটি স্তব্ধ হয়ে গেল যা কঠিন কৌশলকে সমন্বিত নীতিতে রূপান্তর করতে পারত।

লারিজানির রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে ভিন্নমত থাকলেও তার চতুরতা নিয়ে কারও সন্দেহ ছিল না। মার্কিন কর্মকর্তা অ্যালান আয়ার তাকে ‘সুবিধাবাদী ও বাস্তববাদীর এক উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন মিশ্রণ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি যখন প্রয়োজন মনে করতেন তখন উদারপন্থী হতেন, আবার প্রয়োজনে কট্টরপন্থা অবলম্বন করতেও দ্বিধা করতেন না। বিশেষ করে ২০১০-এর দশকে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার সময় তিনি কূটনীতি ও সংলাপের পথ বেছে নিয়েছিলেন, যাতে দেশটির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা কমিয়ে আনা যায়।

তবে এই বাস্তববাদী নেতার মধ্যেও ছিল কড়া হুঙ্কার দেওয়ার ক্ষমতা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি করলে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে চরম পরিণতির হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। এমনকি চলতি বছরের শুরুতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনেও তার কঠোর ভূমিকা লক্ষ্য করা গেছে। অর্থাৎ, লারিজানি ছিলেন এমন একজন নেতা যিনি একদিকে পশ্চিমা বিশ্বের সাথে আলোচনার টেবিলে বসতে পারতেন, আবার দেশের ভেতর নিজের কঠোর অবস্থান ধরে রাখতে জানতেন।

বিশ্লেষকদের মতে, লারিজানির মৃত্যু ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের জন্য বড় আঘাত হলেও এটি দেশটির টিকে থাকাকে সরাসরি হুমকির মুখে ফেলবে না। ইরান এমন একটি বহুস্তরবিশিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে যা এ ধরনের বড় ক্ষতি সামলে নিতে সক্ষম। যদিও লারিজানিকে অনেকে ইরানের নেপথ্য নেতা মনে করতেন কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা সেখানে ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয় বরং প্রাতিষ্ঠানিক। লারিজানির জায়গায় সম্ভবত সাঈদ জলিলির মতো আরও কট্টরপন্থী নেতারা স্থলাভিষিক্ত হবেন।

লারিজানির বিদায় ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কট্টরপন্থীদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে সুপ্রিম লিডার আলী খামেনির উত্তরসূরি হিসেবে তার ছেলে মোজতবা খামেনির মনোনয়নের ক্ষেত্রে লারিজানি যে বিকল্প চিন্তা করছিলেন, তার পথ এখন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেল। সামনের দিনগুলোতে ইরানের আইআরজিসি এবং সুপ্রিম লিডারের দপ্তর আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে। লারিজানির মতো অভিজ্ঞ ও কূটনীতিক জ্ঞানসম্পন্ন নেতার অভাব ইরানকে সম্ভবত আরও বেশি রক্ষণশীল এবং অনমনীয় অবস্থানের দিকে ঠেলে দেবে।

মিডল ইস্ট আইয়ের বিশ্লেষণ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here