যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে ইরানের যুদ্ধ শুরু হওয়ার দুই সপ্তাহ পার হতে না হতেই নির্বাসিত বিরোধী নেতা রেজা পাহলভির ওপর থেকে আস্থা হারাতে শুরু করেছেন অনেক ইরানি।
ইরানের শেষ সম্রাটের পুত্রকে যারা একসময় বর্তমান শাসনব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে দেখছিলেন, তাদের বড় একটি অংশ এখন তার রাজনৈতিক দূরদর্শিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। বিশেষ করে যুদ্ধের এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে চাহারশানবে সুরি উৎসবকে কেন্দ্র করে পাহলভির নতুন করে বিক্ষোভের ডাক দেওয়াকে অবিবেচনাপ্রসূত ও জনবিচ্ছিন্ন সিদ্ধান্ত বলে মনে করছেন সাধারণ মানুষ।
তেহরানের বাসিন্দা ৩৯ বছর বয়সী দিনার মতে, পাহলভি যদি তার বাবার রাজনৈতিক প্রজ্ঞার সামান্য অংশও পেতেন, তবে তিনি বুঝতেন যে এখনকার পরিস্থিতিতে মানুষকে রাস্তায় নামিয়ে দেওয়া মানে তাদের নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া। গত জানুয়ারির বিক্ষোভে কয়েক হাজার মানুষ প্রাণ হারানোর স্মৃতি এখনও দগদগে। দিনা নিজেও সেই বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন কিন্তু এখন তিনি মনে করেন পাহলভি কেবল মানুষকে বুলেটের সামনে দাঁড় করিয়ে দিতেই জানেন কিন্তু তাদের সুরক্ষা দেওয়ার কোনো ক্ষমতা তার নেই। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি অনুযায়ী, সেই সময় নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে প্রায় সাত হাজার মানুষ নিহত হয়েছিল।
বর্তমানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলায় বিপর্যস্ত ইরানি শহরগুলোতে যখন লাশের পাহাড় জমছে, তখন পাহলভির উল্লাসের আহ্বান সাধারণ মানুষের কাছে তামাশার মতো শোনাচ্ছে।
তেহরানের ২১ বছর বয়সী ছাত্র মজিদ জানান, তার চোখের সামনে তার প্রিয় বন্ধুকে গুলি করে মারা হয়েছে। বর্তমানে প্রতি রাতে বিমান হামলার আতঙ্কে থাকা মানুষগুলোর কাছে পাহলভির এই বিক্ষোভের ডাক অত্যন্ত নির্দয় বলে মনে হচ্ছে। সাধারণ মানুষ মনে করছেন, দেশের ভেতরের প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে নির্বাসিত এই নেতার কোনো ধারণাই নেই।
অন্যদিকে, পাহলভির দ্বিমুখী আচরণ এবং কিছু নির্দিষ্ট বিষয়ে তার নীরবতা নিয়ে সমালোচনা এখন চরমে। অভিযোগ উঠেছে, তিনি হামলায় নিহত মার্কিন সেনাদের জন্য শোকবার্তা পাঠালেও নিজ দেশের সাধারণ মানুষ কিংবা মিনাব শহরে স্কুলছাত্রদের নিহতের ঘটনায় কোনো সমবেদনা জানাননি।
গোরগানের বাসিন্দা আমির বলছেন, আগে পাহলভির সমালোচনা করলে তাকে সরকারের দালাল বলে তকমা দেওয়া হতো, কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলেছে। পাহলভির রাজনৈতিক অসংলগ্নতা এবং ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর তার অতি-নির্ভরশীলতা তাকে জনমনে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিভিন্ন মন্তব্যের প্রেক্ষিতে পাহলভি যেভাবে তার অবস্থান পরিবর্তন করেন, তা অনেককেই হতাশ করেছে।
ইরানের বর্তমান অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক। একদিকে বিদেশি শক্তির হামলা, অন্যদিকে দেশের ভেতরে নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর হুঁশিয়ারি সাধারণ ইরানিদের এক চরম অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে। পুলিশ কমান্ডারের সরাসরি গুলি চালানোর হুমকির মুখে চাহারশানবে সুরির মতো উৎসবে রাস্তায় নামার ঝুঁকি কেউ নিতে চাচ্ছেন না। ফলে রেজা পাহলভিকে ঘিরে যে আশার সঞ্চার হয়েছিল, তা এখন ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছে এবং ইরানিরা নিজেদের এক কঠিন রাজনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যে বন্দি বলে মনে করছেন।
সূত্র: মিডলইস্ট আই

