বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের হরমুজ প্রণালীকে বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের প্রধান ধমনী হিসেবে বিবেচনা করা হলেও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক রুবেন এফ. জনসন এক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এনেছেন। তার মতে, বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তাইওয়ান প্রণালী কেবল একটি জলপথ নয় বরং এটি বিশ্ব প্রযুক্তির কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র। ২০২৬ সালের মার্চ মাসে এসে দেখা যাচ্ছে, হরমুজ প্রণালীর সংকটের চেয়েও তাইওয়ানে চীনের সম্ভাব্য অবরোধ বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অনেক বেশি বিধ্বংসী হতে পারে। বিশেষ করে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র দ্বিতীয় সপ্তাহে এসে এই শঙ্কা আরও ঘনীভূত হয়েছে, ফলে মার্কিন প্রশাসনের সামনে ভয়াবহ চ্যালেঞ্জ।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যদি চীন তাইওয়ানকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়, তবে এক বছরেই বিশ্ব অর্থনীতির প্রায় ১০.৬ ট্রিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হতে পারে। এই বিপুল অংকের অর্থ বিশ্ব জিডিপির প্রায় ৯.৬ শতাংশের সমান, যা যেকোনো বড় ধরনের মন্দার চেয়েও ভয়াবহ। তাইওয়ান প্রণালী দিয়ে বর্তমানে বিশ্বের মোট সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রায় ২০ শতাংশ পরিচালিত হয়। ফলে এই পথে কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি হলে কেবল এশিয়াই নয় বরং আমেরিকা ও ইউরোপের বাজারগুলোতেও পণ্যের হাহাকার শুরু হবে এবং সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়বে।
এই সংকটের মূলে রয়েছে সেমিকন্ডাক্টর বা মাইক্রোচিপ শিল্পে তাইওয়ানের একক আধিপত্য। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৯০ শতাংশ উন্নত মাইক্রোচিপ তৈরি হয় তাইওয়ান সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানির কারখানায়। মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত স্মার্টফোন, অটোমোবাইল থেকে শুরু করে উন্নত চিকিৎসা সরঞ্জাম; সবকিছুর প্রাণভোমরা হলো এই চিপ। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, এই সরবরাহ বন্ধ হলে গাড়ি বা ইলেকট্রনিক্স পণ্যের জন্য ক্রেতাদের মাসের পর মাস নয় বরং বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হতে পারে যা বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতিকে আকাশচুম্বী করে তুলবে।
তবে অর্থনৈতিক ক্ষতির চেয়েও বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে মার্কিন প্রতিরক্ষা খাতের ওপর এর প্রভাব। বর্তমানে মার্কিন সামরিক বাহিনী তাদের এফ-৩৫ ফাইটার জেট, জিপিএস স্যাটেলাইট এবং বিভিন্ন ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার জন্য তাইওয়ানের তৈরি চিপের ওপর প্রায় ৯০ শতাংশ নির্ভরশীল। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চালিত আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রের ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের চেয়ে অন্তত এক বা দুই প্রজন্ম পিছিয়ে রয়েছে। ফলে তাইওয়ান অবরুদ্ধ হলে আমেরিকার সামরিক সক্ষমতা এবং জাতীয় নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হবে যা যুদ্ধের ময়দানে তাদের পিছিয়ে দিতে পারে।
চীনের পক্ষ থেকে বিরল মৃত্তিকা (রেয়ার আর্থ) উপাদানের ওপর রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। ২০১৫ সাল থেকেই বেইজিং হোলমিয়াম, আরবিয়াম এবং টার্বিয়ামের মতো ১২টি গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের ওপর কড়াকড়ি শুরু করেছিল। এরপর ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে এসে নতুন লাইসেন্সিং নীতিমালার মাধ্যমে এই নিয়ন্ত্রণকে আরও কঠোর করা হয়েছে। এই উপাদানগুলো আধুনিক প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম তৈরির জন্য অপরিহার্য এবং চীন বিশ্ববাজারে এর সিংহভাগ নিয়ন্ত্রণ করে, যা ওয়াশিংটনের জন্য একটি কৌশলগত ফাঁদ হিসেবে কাজ করছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আসন্ন চীন সফরকে কেন্দ্র করে এই উত্তেজনা এখন ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। একদিকে আমেরিকা ইরানে বিমান হামলা চালিয়ে বেইজিংয়ের তেলের বাজারে চাপ সৃষ্টি করছে, কারণ চীন তাদের তেলের ৮০ শতাংশই ইরান থেকে আমদানি করে। এর পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে চীন যদি তাইওয়ান প্রণালীতে কোনো ধরনের অবরোধ আরোপ করে, তবে তা হবে আমেরিকার জন্য একটি ‘নিউক্লিয়ার অপশন’ বা চরম আঘাতের মতো। বেইজিং এই বাণিজ্যিক ও সামরিক ভারসাম্যকে দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মার্কিন নীতিনির্ধারকরা হয়তো করোনা মহামারীর সময়কার সরবরাহ সংকটের কথা ভুলে গেছেন। তখন সামান্য চিপের অভাবে সারা বিশ্বের উৎপাদন ব্যবস্থা স্থবির হয়ে পড়েছিল। কিন্তু তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে যদি দীর্ঘমেয়াদী কোনো সংকট তৈরি হয়, তবে তার প্রভাব হবে মহামারীর চেয়েও শতগুণ বেশি ভয়াবহ। ওয়াশিংটনের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস) এর আগে সতর্ক করেছিল, আমেরিকার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী থেকে মাত্র ১১০ মাইল দূরের একটি দ্বীপের ওপর এত বিশাল নির্ভরশীলতা কোনোভাবেই নিরাপদ নয়।

