রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের দীর্ঘস্থায়ী শাসনের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন করে জল্পনা শুরু হয়েছে। রুটগার্স ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. আলেকজান্ডার মোটিল সম্প্রতি এক বিশ্লেষণে দাবি করেছেন, রাশিয়ার বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি পুতিনের পতনের জন্য সহায়ক হয়ে উঠছে। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি এবং বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক সংকটের ওপর ভিত্তি করে তিনি দেখিয়েছেন, পুতিন যতটা শক্তিশালী মনে করা হয়, বাস্তবে তিনি ততটাই ভঙ্গুর অবস্থায় থাকতে পারেন।
রাশিয়ার রাজবংশীয় এবং সোভিয়েত আমলের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, দেশটির শাসকদের ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার হার অত্যন্ত বেশি। ১৬১৩ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত ২৭ জন রুশ শাসকের মধ্যে ১২ জনই হয় ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন, নয়তো হত্যার শিকার বা বড় ধরনের বিদ্রোহের মুখে পড়েছেন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী এই হার প্রায় ৪৪ শতাংশ, যা যেকোনো স্থিতিশীল রাষ্ট্রের তুলনায় বেশ উদ্বেগজনক। পুতিন নিজেও একজন শৌখিন ইতিহাসবিদ হওয়ায় এই রূঢ় বাস্তবতা সম্পর্কে অবশ্যই অবগত আছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রোমানভ রাজবংশের শাসনের দিকে তাকালে দেখা যায়, আঠারো জন শাসকের মধ্যে পাঁচজনই চরম পরিণতির শিকার হয়েছিলেন। এদের মধ্যে দ্বিতীয় পিটারকে তার নিজের স্ত্রী ক্যাথরিন ক্ষমতাচ্যুত করেন এবং প্রথম পল নিহত হন বিরোধী অভিজাতদের হাতে। এমনকি রাশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী শাসক দ্বিতীয় নিকোলাসকেও ১৯১৭ সালে বলশেভিক বিপ্লবের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়েছিল এবং পরে তাকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। এই রক্তক্ষয়ী ইতিহাস প্রমাণ করে যে ক্রেমলিনের মসনদ কখনোই পুরোপুরি নিরাপদ ছিল না।
সোভিয়েত ইউনিয়নের আমলে এই চিত্র আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। সে সময়কার সাতজন শাসকের মধ্যে পাঁচজনই কোনো না কোনোভাবে ষড়যন্ত্র বা অভ্যুত্থানের মুখোমুখি হন। লেনিনের ওপর প্রাণঘাতী হামলা থেকে শুরু করে ক্রুশ্চেভকে সরিয়ে ব্রেজনেভের ক্ষমতা দখল পর্যন্ত প্রতিটি ঘটনাই ছিল নাটকীয়। এমনকি সোভিয়েত পতনের কারিগর মিখাইল গর্বাচেভও ১৯৯১ সালে বরিস ইয়েলতসিনের একপ্রকার ক্ষমতা দখলের শিকার হয়েছিলেন। পুতিনের বর্তমান মেয়াদে ইয়েভগেনি প্রিগোজিনের গত বছরের বিদ্রোহ সেই পুরনো স্মৃতিকেই যেন আবার উসকে দিয়েছে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এডওয়ার্ড লুৎওয়াকের তত্ত্ব অনুযায়ী, একটি সফল অভ্যুত্থানের জন্য তিনটি পূর্বশর্ত প্রয়োজন যা বর্তমানে রাশিয়ায় বিদ্যমান। রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত থাকা, একটি কেন্দ্রীয় শাসন কাঠামো এবং বিদেশি প্রভাব থেকে বিচ্ছিন্নতা; এই তিনটি উপাদানই এখন পুতিন শাসিত রাশিয়ায় প্রকট। বিশ্লেষকদের মতে, যখন সাধারণ মানুষের ক্ষোভ প্রকাশের জায়গা বন্ধ হয়ে যায়, তখন ক্ষমতার অভ্যন্তরেই ষড়যন্ত্রের বীজ দানা বাঁধতে শুরু করে যা শেষ পর্যন্ত শীর্ষ নেতার পতনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে রাশিয়ার সামরিক ও অর্থনৈতিক ব্যর্থতা পুতিনের শাসনের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। রুশ সামরিক বাহিনীর ক্ষয়ক্ষতি এবং অর্থনীতির সামরিকায়ন দেশটির উচ্চবিত্ত বা অলিগার্কদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে তরুণ অলিগার্ক (ধনিক শ্রেণি) এবং পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত এলিটরা পুতিনের একরোখা নীতির কারণে তাদের বিলাসজীবন ও বিশ্বজুড়ে প্রভাব হারানোর শঙ্কায় রয়েছেন। এই গোষ্ঠীটি যেকোনো সময় তাদের স্বার্থ রক্ষায় পুতিনের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে।
পুতিনের নিজের তৈরি করা নিরাপত্তা বাহিনীর (এফএসবি) মধ্যেও ফাটল ধরার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। প্রিগোজিনের বিদ্রোহের সময় সেনাবাহিনী বা ন্যাশনাল গার্ডের নিষ্ক্রিয়তা প্রমাণ করেছে, সংকটের সময় তারা হয়তো পুতিনের জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত নয়। অনেক কট্টর জাতীয়তাবাদী সামরিক ব্লগারও এখন প্রকাশ্যেই যুদ্ধের অব্যবস্থাপনা নিয়ে সমালোচনা করছেন। এই অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ যদি কোনো একবিন্দুতে মিলিত হয়, তবে তা পুতিনের জন্য বড় ধরনের বিপদ ডেকে আনতে পারে।
সূত্র: নাইটটিন ফোরটি ফাইভ

