টাঙ্গাইলের যমুনা তীরবর্তী চরাঞ্চলের চিকচিকে বালুচরে এখন দিগন্তজোড়া হলুদ আভা। ধু ধু বেলে-দোআঁশ মাটিতে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে বড় বড় থালার মতো সূর্যমুখী ফুল। ভোরের আলো ফুটতেই যমুনা নদীর তীরে ঝলমল করে ওঠে সোনালি হাসি। একসময় অনাবাদি পড়ে থাকা এসব চরভূমিতে এখন সূর্যমুখী চাষে ব্যাপক সাফল্য মিলেছে। ফলে কৃষকের মুখেও ফুটেছে স্বস্তির হাসি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরে জেলার ১২টি উপজেলায় মোট ১৭৮ হেক্টর জমিতে সূর্যমুখীর চাষ হয়েছে। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ৪৫ হেক্টর, বাসাইলে ৪৬ হেক্টর, কালিহাতীতে ৮ হেক্টর, ঘাটাইলে ১০ হেক্টর, নাগরপুরে ১০ হেক্টর, মির্জাপুরে ১০ হেক্টর, মধুপুরে ১৪ হেক্টর, ভূঞাপুরে ৫ হেক্টর, গোপালপুরে ৫ হেক্টর, সখীপুরে ৩ হেক্টর, দেলদুয়ারে ২০ হেক্টর এবং ধনবাড়ীতে ২ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে। গত বছরের তুলনায় এবার ৮-১০ হেক্টর বেশি জমিতে সূর্যমুখী চাষ হয়েছে।
আবহাওয়া অনুকূলে থাকা ও কৃষি বিভাগের পরামর্শে চরাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকায় এই তৈলবীজ চাষে নীরব বিপ্লব ঘটেছে। সখের চাষ এখন বাণিজ্যিক রূপ পেয়েছে। হলুদ ফুলের সমারোহ দেখতে প্রতিদিন ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা। পাশাপাশি লাভের হিসাব কষছেন কৃষকরা।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সূর্যমুখী চাষে খরচ তুলনামূলক কম, কিন্তু লাভ বেশি। প্রতি বিঘা জমিতে ৫-৬ হাজার টাকা খরচে চাষ করা সম্ভব। ভালো ফলন হলে বিঘাপ্রতি ২০-২৫ হাজার টাকার বীজ বিক্রি করা যায়। পাশাপাশি সূর্যমুখীর খৈল মাছ ও পশুখাদ্য হিসেবে এবং শুকনো গাছ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
কাকুয়া ইউনিয়নের কৃষক আলিম উদ্দিন ও আওয়াল জানান, আগে বেলে জমিতে বাদাম, তিল বা তিশি আবাদ করলেও ফলন কম হতো। সূর্যমুখীতে খরচ কম, উৎপাদন বেশি এবং লাভও বেশি।
চর বেলটিয়াবাড়ি গ্রামের কৃষক আজর আলী বলেন, “আগে এসব জমিতে তেমন ফসল হতো না। কৃষি অফিসের পরামর্শে এবার সূর্যমুখী লাগিয়েছি। গাছ ভালো হয়েছে, প্রতিটি ফুলে দানা পুষ্ট। বাজারে ভালো দাম পাব বলে আশা করছি।”
কৃষিবিদদের মতে, রবি মৌসুমে (অগ্রহায়ণ থেকে মধ্য-ডিসেম্বর) সূর্যমুখী চাষ সবচেয়ে উপযোগী হলেও সারা বছরই আবাদ সম্ভব। সুনিষ্কাশিত বেলে-দোআঁশ বা দোআঁশ মাটি এ ফসলের জন্য উপযুক্ত। ভালো ফলনের জন্য সাধারণত ২-৩ বার সেচ প্রয়োজন হয়—চারা গজানোর ২৫-৩০ দিন পর এবং ফুল আসার আগে। আগাছা পরিষ্কার ও নিয়মিত নিড়ানি দেওয়া জরুরি।
বাংলাদেশে সাধারণত বারি সূর্যমুখী-২, বারি সূর্যমুখী-৩, ডিএস-১ এবং হাইসান-৩৩ (হাইব্রিড) জাতের চাষ হয়। বারি সূর্যমুখী-২ জাতের গাছে ৪২-৪৪ শতাংশ পর্যন্ত তেল পাওয়া যায়।
পুষ্টিবিদদের মতে, সূর্যমুখীর তেল হৃদরোগীদের জন্য উপকারী এবং এতে কোলেস্টেরল কম। বাজারে সয়াবিন তেলের দাম বাড়ায় স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সূর্যমুখী তেলের চাহিদা বেড়েছে। জেলার ১৭৮ হেক্টর জমির ফলন স্থানীয় তেলের বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা মোহাম্মদ দুলাল উদ্দিন বলেন, সূর্যমুখী চাষে কৃষকদের আগ্রহ বাড়াতে সরকার প্রণোদনা দিচ্ছে। নিয়মিত প্রশিক্ষণ, পরামর্শ ও বীজ-সার সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
উপ-পরিচালক মো. আশেক পারভেজ জানান, ভোজ্যতেলের আমদানি নির্ভরতা কমাতে কৃষকদের এই অর্থকরী ফসল চাষে উৎসাহিত করা হচ্ছে। যমুনার পলিবিধৌত উর্বর মাটি সূর্যমুখী চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী হওয়ায় ফলনও আশাতীত হয়েছে।
সব মিলিয়ে, যমুনার চরে এখন শুধু ফুল নয়—ফুটছে সম্ভাবনা। সূর্যমুখীর সোনালি হাসি টাঙ্গাইলের কৃষি অর্থনীতিতে নতুন দিগন্তের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

