ইরানের রাজনীতি, সামরিক কৌশল ও পশ্চিমবিরোধী অবস্থান- সবকিছুর কেন্দ্রে ছিলেন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। ১৯৮৯ সালে সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার পর থেকে তিনি শুধু একজন ধর্মীয় নেতাই নন, বরং ইরানের প্রতিরোধ নীতির প্রধান রূপকার হয়ে ওঠেন। ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় তাঁর মৃত্যুর খবরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা।
১৯৩৯ সালে উত্তরপূর্ব ইরানের পবিত্র শিয়া নগরী মাশহাদে জন্ম নেন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। তাঁর বাবা ছিলেন একজন খ্যাতনামা মুসলিম নেতা এবং জাতিগতভাবে আজারবাইজানি, যিনি প্রতিবেশী ইরাক থেকে ইরানে আসেন। পরিবারটি প্রথমে তাবরিজে বসতি স্থাপন করে, পরে মাশহাদে চলে যায়, যেখানে তাঁর বাবা একটি আজারবাইজানি মসজিদের নেতৃত্ব দেন।
খামেনি চার বছর বয়সে কোরআন শিক্ষা শুরু করেন। মাশহাদের একটি ইসলামি বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করেন। উচ্চ বিদ্যালয় শেষ না করে তিনি ধর্মতত্ত্ব শিক্ষায় মনোনিবেশ করেন। শেখ হাশেম গাজভিনি সহ সে সময়ের খ্যাতনামা আলেমদের কাছে শিক্ষা নেন। পরে নাজাফ, কোমের উচ্চতর শিয়া শিক্ষা কেন্দ্রে পড়াশোনা করেন। কোমে তিনি আয়াতুল্লাহ রুহোল্লাহ খোমেনির ঘনিষ্ঠ হন, যিনি শাহবিরোধী অবস্থানের কারণে তরুণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে জনপ্রিয় ছিলেন।
১৯৫৩ সালে এমআই৬, সিআইএ সমর্থিত অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেগকে অপসারণের পর শাহ পূর্ণ ক্ষমতা ফিরে পান। সেই সময় থেকেই খামেনি রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হন। শাহের গোপন পুলিশ সাভাক তাকে একাধিকবার গ্রেপ্তার করে এবং ইরানশাহরে নির্বাসনে পাঠায়। ১৯৭৮ সালের বিক্ষোভে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশ নেন, যা পাহলভি শাসনের অবসান ঘটায়।
ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর তিনি ১৯৮০ সালে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ইরান ইরাক যুদ্ধ শুরুর পর আইআরজিসি তদারকির দায়িত্ব পান। তেহরানের জুমার নামাজের খতিব হিসেবেও প্রভাবশালী ভূমিকা রাখেন।
১৯৮১ সালে মোজাহেদিন ই খালক এমইকে গোষ্ঠীর হামলায় তিনি অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান, তবে ডান হাতের ব্যবহার হারান। একই বছর তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন এবং ইরানের প্রথম ধর্মীয় পদাধিকারী প্রেসিডেন্ট হন।
১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহোল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর এক সাংবিধানিক পরিষদ খামেনিকে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নিয়োগ দেয়। সে সময় সর্বোচ্চ পদে থাকার যোগ্যতার শর্ত শিথিল করা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান ইরাক যুদ্ধ, পশ্চিমা দেশগুলোর সমর্থনে সাদ্দাম হোসেনের অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা খামেনির পশ্চিমবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও গভীর করে। ভ্যালি নাসর বলেন, ইরানকে সবসময় হুমকির মুখে থাকা রাষ্ট্র হিসেবে দেখতেন খামেনি। তাঁর বিশ্বাস ছিল, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের প্রতি শত্রুভাবাপন্ন এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদকে একসঙ্গে রক্ষা করতে হবে।
এই দৃষ্টিভঙ্গির অধীনে আইআরজিসি একটি শক্তিশালী সামরিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। তিনি প্রতিরোধ অর্থনীতির ধারণা সামনে আনেন, যাতে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে স্বনির্ভরতা বাড়ানো যায়। সমালোচকরা বলেন, এই কঠোর নিরাপত্তা নীতি সংস্কারের পথ সংকুচিত করেছে।
২০০৯ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের পর বিক্ষোভ, ২০২২ সালে নারীদের অধিকার ইস্যুতে আন্দোলন এবং সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক সংকট—সব মিলিয়ে তাঁর শাসনামলে একাধিক চ্যালেঞ্জ আসে। জানুয়ারিতে অর্থনৈতিক দুর্ভোগ থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ দেশজুড়ে অস্থিরতায় রূপ নেয়, যা ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর সবচেয়ে সহিংস পরিস্থিতির একটি হিসেবে বিবেচিত হয়।
সমালোচকদের মতে, জাতীয় স্বাধীনতার প্রশ্নে তাঁর কঠোর অবস্থানের মূল্য ইরানের জনগণকে চড়া দামে দিতে হয়েছে। তবে সমর্থকদের চোখে তিনি ছিলেন ইরানের প্রতিরোধ ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক।
সোর্স: আল-জাজিরা

