ইরানে হামলা হলে সবচেয়ে বেশি ভুগবে চীন?

0
ইরানে হামলা হলে সবচেয়ে বেশি ভুগবে চীন?

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার উত্তেজনাকে সাধারণত আঞ্চলিক সংঘাত হিসেবে দেখা হলেও এর গভীরে লুকিয়ে আছে বিশ্বশক্তির আধিপত্যের লড়াই। বিশেষ করে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যকার কৌশলগত প্রতিযোগিতায় ইরান এখন গুরুত্বপূর্ণ দাবার ঘুঁটি হয়ে উঠেছে। 

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের বিরুদ্ধে যেকোনো সামরিক পদক্ষেপ বা উত্তেজনা মূলত চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করার একটি পরোক্ষ মাধ্যম। যেহেতু চীন বিশ্বের বৃহত্তম জ্বালানি আমদানিকারক দেশ এবং তাদের শিল্পায়নের চাকা সচল রাখতে ইরানি তেলের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল, তাই তেহরানের ওপর আঘাত আসার অর্থ হলো বেইজিংয়ের সরবরাহ শৃঙ্খলে সরাসরি বিঘ্ন ঘটানো।

চীনের মোট সমুদ্রজাত তেল আমদানির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আসে ইরান থেকে, যা দৈনিক প্রায় ১৩.৮ লক্ষ ব্যারেলে পৌঁছেছে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার তোয়াক্কা না করে চীন এই তেল সস্তায় সংগ্রহ করে তাদের উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখে। এমতাবস্থায় পারস্য উপসাগরে কোনো অস্থিরতা তৈরি হলে তেলের বাজারে অস্থিরতা দেখা দেবে এবং বিমার খরচসহ জাহাজ ভাড়া বহুগুণ বেড়ে যাবে। এই বর্ধিত জ্বালানি ব্যয় চীনের জন্য একটি অঘোষিত কর হিসেবে দেখা দেবে। এতে চীনের বৈশ্বিক বাজারজাত পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেবে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিকে মুদ্রাস্ফীতির মুখে ঠেলে দেবে।

অন্যদিকে, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ইরান কেবল জ্বালানি উৎস নয়, বরং চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ উদ্যোগের একটি অপরিহার্য সংযোগস্থল। মধ্য এশিয়া, তুরস্ক এবং আরব সাগরের মাঝে ইরানের অবস্থান বেইজিংকে এমন এক বিকল্প বাণিজ্য পথ তৈরির সুযোগ দেয় যা মার্কিন নৌবাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরতা কমায়। যদি ইরান যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে বা অস্থিতিশীল হয়, তবে চীনের এই দীর্ঘমেয়াদী অবকাঠামোগত পরিকল্পনা ভেস্তে যাবে। এতে করে বেইজিং পুনরায় সেইসব নৌপথের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হবে যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র আধিপত্য বিদ্যমান, যা কার্যত চীনের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনকে খর্ব করবে।

যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান জ্বালানি সক্ষমতা এই সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলেছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই রেকর্ড পরিমাণ তেল উৎপাদন করছে এবং রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে কোনো সংকট তৈরি হলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়লেও ওয়াশিংটন তার অভ্যন্তরীণ উৎপাদন দিয়ে সেই ধাক্কা সামলে নেওয়ার সক্ষমতা রাখে। পক্ষান্তরে, চীনের সেই বিলাসিতা নেই। ভেনেজুয়েলার মতো বিকল্প উৎসগুলোর ওপর মার্কিন নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধির সম্ভাবনা বেইজিংয়ের জন্য ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। অর্থাৎ, ইরান সংকটকে ব্যবহার করে চীনকে এক ধরনের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অবরোধের মুখে ফেলার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

তবে এই কৌশলের সীমাবদ্ধতাও রয়েছে এবং এটি দীর্ঘমেয়াদে উল্টো ফল বয়ে আনতে পারে। ইরানের ওপর ক্রমাগত চাপ বেইজিংকে বিকল্প ব্যবস্থা তৈরিতে আরও মরিয়া করে তুলবে, ফলে ডলার-বহির্ভূত লেনদেন এবং রাশিয়ার মতো দেশগুলোর সাথে আরও গভীর জ্বালানি জোট গঠনে সহায়ক হবে। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ বা উত্তেজনা কেবল চীনকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে না বরং বিশ্বজুড়ে মার্কিন মিত্রদের অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। শেষ পর্যন্ত ইরান ইস্যুটি কেবল মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা প্রশ্ন নয় বরং এটি বিশ্ব অর্থনীতির ভারসাম্য এবং চীনের উত্থান ঠেকানোর এক বহুমুখী ভূ-রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে।

সূত্র: আরটি

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here