মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নৌ ও বিমান বাহিনীর নজিরবিহীন সেনা সমাবেশের মাধ্যমে ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের রূপরেখা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সম্প্রতি এই অঞ্চলে দুটি বিমানবাহী রণতরী স্ট্রাইক গ্রুপসহ বিপুল সংখ্যক যুদ্ধবিমান, বোমারু বিমান এবং রিফুয়েলিং এয়ারক্রাফট মোতায়েন করেছে পেন্টাগন।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, পারমাণবিক আলোচনা ব্যর্থ হলে তেহরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের বিমান হামলার ক্ষেত্র প্রস্তুত করতেই এই বিশাল বাহিনী জড়ো করা হয়েছে। অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন বিমান কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমান বাহিনীর বিন্যাস কেবল প্রতীকী চাপের জন্য নয় বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী এবং টেকসই যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবেই প্রতীয়মান হচ্ছে।
এই বিশাল নৌবহরে যুক্ত হয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড এবং ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন। গত জানুয়ারির শেষ দিক থেকে আরব সাগরে অবস্থান নেওয়া এই বহরে ১৪টি যুদ্ধজাহাজ এবং ৪০ হাজারেরও বেশি সেনা রয়েছে। দক্ষিণ চীন সাগর ও ক্যারিবীয় অঞ্চল থেকে এসব রণতরীকে জরুরি ভিত্তিতে মধ্যপ্রাচ্যে সরিয়ে আনা হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতোমধ্যে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে চলমান আলোচনা কোনো ইতিবাচক সমাধানে না পৌঁছালে সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প থাকবে না।
পেন্টাগনের এই যুদ্ধ প্রস্তুতির সবচেয়ে বড় সূচক হিসেবে দেখা হচ্ছে বিপুল সংখ্যক ট্যাঙ্কার এবং আর্লি ওয়ার্নিং বা অ্যাওয়াক্স বিমানের উপস্থিতিকে। সামরিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মতে, মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমানে ১৭০টিরও বেশি কার্গো বিমান এবং ৮৫টিরও বেশি আকাশপথে জ্বালানি সরবরাহকারী ট্যাঙ্কার মোতায়েন করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যখন কোনো অভিযানে এই পর্যায়ের লজিস্টিক সহায়তা এবং যুদ্ধক্ষেত্র ব্যবস্থাপনার বিমান যুক্ত করা হয়, তখন বুঝতে হবে যুক্তরাষ্ট্র একটি সুপরিকল্পিত এবং বড় আকারের বিমান হামলার দিকেই এগোচ্ছে। এটি কোনো ছোটখাটো আক্রমণ নয় বরং তেহরানের সামরিক অবকাঠামো গুঁড়িয়ে দেওয়ার একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা।
হোয়াইট হাউসের প্রাথমিক লক্ষ্য হলো ইরানের ওপর সর্বোচ্চ চাপ সৃষ্টি করে একটি কঠোর পারমাণবিক চুক্তিতে বাধ্য করা। তবে প্রশাসনের ভেতরে একটি বড় অংশ মনে করছে, কেবল সীমিত হামলা চালিয়ে তেহরানের অবস্থান পরিবর্তন করা সম্ভব নাও হতে পারে। যদি সীমিত সামরিক পদক্ষেপে কাজ না হয়, তবে ওয়াশিংটন ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের মতো কঠোর পথে হাঁটতে পারে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার উপদেষ্টাদের জানিয়েছেন, কূটনীতি বা লক্ষ্যভেদী হামলা ব্যর্থ হলে তিনি পরবর্তী কয়েক মাসের মধ্যে আরও ব্যাপক এবং বিস্তৃত বিমান হামলা চালানোর বিকল্প পথ খোলা রেখেছেন।
ইরানি নেতারা আশঙ্কা করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য এই হামলার মূল লক্ষ্য হবে দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামো ধ্বংস করা, যাতে তেহরানের আঞ্চলিক সক্ষমতা ও প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে। তবে হোয়াইট হাউসের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি স্থায়ীভাবে বন্ধ করা। ট্রাম্প প্রশাসন এমন একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে চায় যা ইরানকে ভবিষ্যতে কখনোই গণবিধ্বংসী অস্ত্র তৈরির সুযোগ দেবে না। ওবামা প্রশাসনের অসম্পূর্ণ কাজ সফলভাবে শেষ করে নিজের রাজনৈতিক বিজয় নিশ্চিত করতে ট্রাম্প এখন মরিয়া হয়ে উঠেছেন।
তবে ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের এই পরিকল্পনা নিয়ে খোদ মার্কিন প্রশাসনের ভেতরেই নানা সংশয় দেখা দিয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং অন্যান্য বিশ্লেষকরা প্রশ্ন তুলেছেন, বর্তমান নেতৃত্বকে সরিয়ে দিলে তার বিকল্প কে হবে। মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, ইরানের জটিল ক্ষমতার কাঠামোয় কোনো ধরনের নেতৃত্ব নিধনের হামলা হিতে বিপরীত হতে পারে। এর ফলে ইরানের ভেতরে এমন এক চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে যা সামলানো পরবর্তী সময়ে মার্কিন বাহিনীর জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুমে সম্প্রতি একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং সিআইএ পরিচালকসহ শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে সামরিক অভিযানের খুঁটিনাটি কৌশল নিয়ে আলোচনা হলেও অভিযানের পরবর্তী পরিস্থিতি বা দীর্ঘমেয়াদী ফলাফল নিয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি। কিছু সূত্রের খবর অনুযায়ী, ইরানকে সীমিত পর্যায়ে পারমাণবিক গবেষণার সুযোগ দিয়ে একটি সম্মানজনক প্রস্থানের পথ খোঁজা হচ্ছে, তবে দুই পক্ষের অনড় অবস্থানের কারণে তা কতটা ফলপ্রসূ হবে তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।
সূত্র: নাইনটিন ফোরটি ফাইভ

