সদ্য অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। তবে সরকার ক্ষমতায় যাওয়ার আগে থেকেই দেশের অর্থনীতির দুর্বলতা ছিল স্পষ্ট। ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দাভাব ও বিনিয়োগে ভাটা এবং ব্যাংকিং খাতে আছে অস্থিরতা। লাগামহীন সুদের হারও পরিস্থিতিকে খারাপ করেছে।
এখনো পুঁজিবাজারে আছে ভরসার অভাব। আশানুরূপ অবস্থায় নেই আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি। সংকুচিত হয়েছে কর্মসংস্থান। ফলে টান পড়েছে সরকারের কোষাগারে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) রাজস্ব ঘাটতি ছাড়িয়েছে ৬০ হাজার কোটি টাকা।
এনবিআরের তথ্য-উপাত্ত বলছে, অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ছিল দুই লাখ ৮৩ হাজার ৭৫১ কোটি টাকা। অথচ এ সময় রাজস্ব আয়ের তিনটি খাতে রাজস্ব ঘাটতি হয়েছে ৬০ হাজার ১১৩ কোটি টাকা। সবচেয়ে বড় ঘাটতি হয়েছে আয়কর খাতে।
এ খাতে ঘাটতি ২৮ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা। আমদানি পর্যায়ে ঘাটতি হয়েছে ১৫ হাজার ৬৮৩ কোটি টাকা। ভ্যাট খাতে ঘাটতি হয়েছে ১৫ হাজার ৫০৬ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারের রাজস্ব আয়ের এ চিত্র ভোগাবে নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারকে।
আলোচ্য সময়ে আয়কর খাতের লক্ষ্য ছিল এক লাখ তিন হাজার ৯৮০ কোটি টাকা।
অথচ আদায়ের পাল্লায় যোগ হয়েছে মাত্র ৭৫ হাজার ৫৫ কোটি টাকা। কম্পানি শ্রেণির করদাতারা অগ্রিম আয়কর, উৎস করসহ সারা বছরই বিভিন্ন ধরনের কর রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেন। এ ছাড়া ব্যক্তি পর্যায়ের করদাতারাও আয়কর জমা দেন রাষ্ট্রীয় কোষাগারে। আয়ের খাত সংকুচিত হওয়ায় বড় পতনের মুখে পড়েছে আয়কর খাত।
ব্যবসায়ীরা অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তাঁদের ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণে খুব একটা এগিয়ে আসেননি। বিনিয়োগও আসেনি। এ ছাড়া সরকারি প্রকল্পও স্থবির। ফলে শিল্প ও প্রকল্পের কাঁচামাল আমদানি অনেকাংশে কমেছে। আমদানি খাতে তেমন শুল্ক পায়নি সরকার। তাই ৭৮ হাজার ৪৯৬ কোটি টাকা লক্ষ্য থাকলেও আদায় হয়েছে মাত্র ৬২ হাজার ৮১৪ কোটি টাকা।
আমদানি-উৎপাদন থেকে বিপণন পর্যন্ত প্রতিটি স্তরেই পরিশোধ করতে হয় ভ্যাট। আলোচ্য সময়ে ৮৫ হাজার ৭৬৯ কোটি টাকা আদায় করেছে এনবিআর। অথচ এ সময় তা আদায়ের লক্ষ্য ছিল এক লাখ এক হাজার ২৭৫ কোটি টাকা। উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও মানুষের আয় কমে যাওয়ার কারণে ভোগের পরিমাণ কমায় তার প্রভাব পড়েছে ভ্যাট খাতে।
বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবু বলেন, ‘দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের টার্নওভার বাড়বে, রাজস্ব আদায়ও বাড়বে। আয় না বাড়লে ট্যাক্স আসবে কিভাবে? দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না থাকলে বিনিয়োগ হয় না। এখন সরকার ব্যবসার ক্ষেত্রে করনীতি, বিদ্যুৎ-জ্বালানি, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিসহ সব বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেয় সে বিবেচনায় বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণ হবে। পরিস্থিতি ভালো না হলে ব্যবসায়ীরা বড় অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করবেন কেন?’
তথ্য-উপাত্ত বলছে, মানুষের আয় বাড়ছে না। সরকারি হিসাবে জানুয়ারি মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৫৮ শতাংশ। গত বছরের নভেম্বর-ডিসেম্বরেও বেশি ছিল মূল্যস্ফীতি। তথ্য-উপাত্ত দেখায়, বাসাভাড়া, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে ব্যয়ের চাপ বেড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচ্চ সুদের হার বহাল রেখে মূল্যস্ফীতি কমানোর নীতির কাঙ্ক্ষিত ফল এখনো আসেনি।
সূত্র : কালের কণ্ঠ

