ট্রাম্পের চরমপত্র, ইরানের হুঁশিয়ারি: ঘনিয়ে আসছে যুদ্ধ?

0
ট্রাম্পের চরমপত্র, ইরানের হুঁশিয়ারি: ঘনিয়ে আসছে যুদ্ধ?

ইরানের সাথে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার পারদ চড়িয়ে মধ্যপ্রাচ্যে বিশাল এক সামরিক সমাবেশ শুরু করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে তাদের পরমাণু কর্মসূচি এবং ব্যালিস্টিক মিসাইল নিয়ে নতুন চুক্তিতে আসার জন্য সর্বোচ্চ ১০ থেকে ১৫ দিন সময় বেঁধে দিয়েছেন। এই চরমপত্র জারির পর থেকেই ওই অঞ্চলে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে একের পর এক অত্যাধুনিক যুদ্ধাস্ত্র মোতায়েন করা হচ্ছে। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় সমরবিদরা মনে করছেন যে কোনো সময় সেখানে বড় ধরনের সংঘাতের সূত্রপাত হতে পারে।

মার্কিন নৌবাহিনীর গর্ব এবং বিশ্বের বৃহত্তম বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড বর্তমানে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে ভূমধ্যসাগরের দিকে এগোচ্ছে। এটি খুব শীঘ্রই ওমান উপকূলে অবস্থানরত আব্রাহাম লিঙ্কন ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপের সাথে যোগ দেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই দুই বিশাল নৌবহরের একত্রীকরণ ওই অঞ্চলে আমেরিকার ব্যাপক আক্রমণাত্মক সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে। একইসাথে সাগরে অবস্থানরত গাইডেড মিসাইল ডেস্ট্রয়ারগুলো টমাহক ক্রুজ মিসাইল নিয়ে যেকোনো সময় ইরানের অভ্যন্তরে আঘাত হানার জন্য প্রস্তুত রয়েছে।

আকাশপথে আধিপত্য বজায় রাখতে যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যেই ১২০টিরও বেশি যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেছে। ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় বিমানশক্তি বৃদ্ধির নজির এটিই। এর মধ্যে রয়েছে অত্যাধুনিক এফ-৩৫ এবং এফ-২২ স্টিলথ ফাইটার জেটের মতো বিধ্বংসী সব যুদ্ধবিমান। এছাড়া গোয়েন্দা নজরদারির জন্য ই-৩ সেন্ট্রি অ্যাওয়াক্স বিমানগুলোও নিয়মিত টহল দিচ্ছে। ওপেন-সোর্স ইন্টেলিজেন্স ডেটা অনুযায়ী, মার্কিন এবং ইউরোপীয় ঘাঁটিগুলো থেকে নিয়মিত রসদবাহী বিমান এবং তেলের ট্যাঙ্কার উড়তে দেখা যাচ্ছে যা একটি দীর্ঘমেয়াদী সামরিক অভিযানের প্রস্তুতির ইঙ্গিত দেয়।

এই সামরিক উত্তেজনার মধ্যেই ভারত মহাসাগরের ডিয়েগো গার্সিয়া সামরিক ঘাঁটি নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যুক্তরাজ্যের এক নজিরবিহীন কূটনৈতিক টানাপোড়েন শুরু হয়েছে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার সাফ জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের আশঙ্কায় ইরান বিরোধী কোনো অভিযানে ব্রিটিশ ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। এর প্রতিক্রিয়ায় ক্ষুব্ধ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চাগোস দ্বীপপুঞ্জ মরিশাসকে ফেরত দেওয়ার ব্রিটিশ সিদ্ধান্তে মার্কিন সমর্থন প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। এই কৌশলগত ঘাঁটিটি হাতছাড়া না করার জন্য লন্ডনকে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।

পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ইরানও বসে নেই। তেহরান স্পষ্ট করে দিয়েছে যেকোনো ধরনের আগ্রাসনের শিকার হলে তারা এর কঠোর ও আনুপাতিক জবাব দেবে। ইতিমধ্যে ওমান উপসাগর এবং উত্তর ভারত মহাসাগরে রাশিয়ার সাথে যৌথ নৌ মহড়া শুরু করেছে তেহরান। মহড়া চলাকালীন ইরান দক্ষিণ ইরানের আকাশে রকেট উৎক্ষেপণের জন্য বিশেষ সতর্কতা জারি করেছে এবং হরমুজ প্রণালীর গুরুত্বপূর্ণ কিছু অংশ সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে। এর মাধ্যমে ইরান বিশ্বকে তাদের সামরিক সক্ষমতা এবং কৌশলগত অবস্থানের গুরুত্ব মনে করিয়ে দিতে চাইছে।

স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া সাম্প্রতিক ছবিগুলোতে দেখা যাচ্ছে, ইরান তাদের গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক এবং সামরিক স্থাপনাগুলোকে মাটির নিচে আরও সুরক্ষিত করার চেষ্টা করছে। গত বছর ইসরায়েল ও আমেরিকার বিমান হামলার পর ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলোতে এখন কংক্রিটের ঢাল এবং মাটির আস্তরণ দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি এবং টানেলগুলো এমনভাবে সংস্কার করছে যাতে সেগুলো দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতের সময় কার্যকর থাকে। তেহরান সম্ভবত সরাসরি যুদ্ধে না জড়িয়ে মার্কিন বাহিনীকে একটি দীর্ঘ এবং ব্যয়বহুল চোরাগোপ্তা যুদ্ধের ফাঁদে ফেলতে চাইছে।

সমর বিশেষজ্ঞ মার্ক ক্যানসিয়ানের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের এই বর্তমান পরিস্থিতি গত বছরের ভেনেজুয়েলা অভিযানের কথা মনে করিয়ে দিলেও ইরানের ভৌগোলিক অবস্থান এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একে অনেক বেশি জটিল করে তুলেছে। তিনি মনে করেন যদি শেষ পর্যন্ত হামলা হয় তবে তা সম্ভবত হবে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা যা মূলত ইরানের ইসলামি রেভোলিউশনারি গার্ড কোর আইআরজিসি-র ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে চালানো হবে। তবে ইরানের অভ্যন্তরে থাকা পারমাণবিক স্থাপনাগুলো মাটির অনেক গভীরে হওয়ায় সেখানে কেবল ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে পূর্ণ বিজয় অর্জন করা অসম্ভব হতে পারে।

সার্বিক পরিস্থিতি এখন এক চরম অনিশ্চয়তার দিকে ধাবিত হচ্ছে যেখানে একটি ছোট ভুল পদক্ষেপও পুরো অঞ্চলকে অনিয়ন্ত্রিত অগ্নিকাণ্ডের দিকে ঠেলে দিতে পারে। আগামী ২৮শে ফেব্রুয়ারি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ইসরায়েল সফরে যাচ্ছেন যেখানে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সাথে তার গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের কথা রয়েছে। কূটনৈতিক আলোচনার পথ যখন ক্রমশ সরু হয়ে আসছে, তখন মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে জমতে থাকা যুদ্ধের কালো মেঘ বিশ্ব অর্থনীতির ওপরও দীর্ঘমেয়াদী ছায়া ফেলবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সূত্র: আল জাজিরা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here