কুমিল্লার হোমনা উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকা রামকৃষ্ণপুর। একদিকে কুমিল্লা, অন্যদিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া—দুই জেলার সংযোগস্থলে অবস্থিত এ জনপদ। গ্রামের বাজার থেকে একটি সড়ক চলে গেছে হোমনা উপজেলা সদরের দিকে। সড়কটি তিতাস নদীর পাড় ঘেঁষে বিস্তৃত। নদীপথে ভটভট শব্দ তুলে ট্রলার ছুটে চলে দূর গন্তব্যে, আর সড়কজুড়ে ছোট-বড় নানা যানবাহনের ব্যস্ত চলাচল।
এই ব্যস্ততার মাঝেই রামকৃষ্ণপুর এলাকার আখন্দপাড়ায় নদীর তীরে প্রায় আড়াইশ’ বছর ধরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে একটি প্রাচীন বটগাছ। স্থানীয়দের কাছে এটি পরিচিত ‘নুরার মা’র বটগাছ’ নামে। সম্প্রতি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় গাছটিকে ‘স্মারক বৃক্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। তবে এলাকাবাসীর দাবি, গাছটির সংরক্ষণে প্রয়োজন আরও কার্যকর উদ্যোগ।
প্রকৃতি ও জনজীবনের মেলবন্ধন
সরেজমিনে দেখা যায়, ব্যস্ত সড়ক ও নদীপথের কোলাহলের মাঝেও গাছটির ছায়ায় থমকে দাঁড়ান পথচারীরা। কেউ বসেন শেকড়ে, কেউবা ছায়ায় বিশ্রাম নেন। বিশাল ডালপালা ছড়িয়ে থাকা গাছটি যেন প্রকৃতির এক জীবন্ত প্রতীক। হালকা বাতাসে পাতার মৃদু আন্দোলন চারপাশে এনে দেয় প্রশান্তির আবেশ।
গ্রামের নারীরা রান্নার জ্বালানির জন্য ঝরে পড়া পাতা কুড়িয়ে নিচ্ছেন। শিশুরা ডালে উঠে খেলায় মেতে উঠছে। নদীতে কেউ কচুরিপানা সংগ্রহ করছেন গবাদিপশুর খাদ্য হিসেবে, আবার কেউ ব্যস্ত ঘাটের নিত্যকার কাজে। গাছের পাতার ফাঁকে পাখির কলকাকলিতে মুখরিত চারপাশ।
গাছটির নামকরণের সুনির্দিষ্ট ইতিহাস না পাওয়া গেলেও, স্থানীয়দের মুখে মুখে প্রচলিত রয়েছে নানা গল্প ও জনশ্রুতি।
লোককথা ও উৎসবের কেন্দ্র
গ্রামের বাসিন্দা রুবেল রানা, গোলাম মোস্তফা ও মো. মুকুদ্দুস জানান, গাছটির বয়স আড়াইশ’ বছরেরও বেশি। তাঁদের দাদাদের কাছ থেকেও শুনেছেন, পূর্বপুরুষেরা গাছটিকে এমনই বিশাল রূপে দেখেছেন। প্রতিবছর পহেলা বৈশাখে গাছতলায় বসে মেলা, যেখানে বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের মিলনমেলা ঘটে। দূর-দূরান্ত থেকে দর্শনার্থীরা আসেন গাছটি দেখতে।
গাছের কাণ্ডে বয়সের ছাপ স্পষ্ট। স্থানীয়দের মধ্যে একসময় এখানে অলৌকিক ঘটনার জনশ্রুতিও ছিল, যা গাছটিকে ঘিরে রহস্যময় আবহ তৈরি করেছে।
সংরক্ষণে প্রয়োজন উদ্যোগ
পরিবেশবাদী সংগঠন গ্রিন ভয়েস-এর সহ-সমন্বয়ক মো. হুমায়ুন কবির সুমন বলেন, তাদের আবেদনের পর সরকার গাছটিকে স্মারক বৃক্ষ ঘোষণা করেছে। তবে এখনো সেখানে স্থায়ী সাইনবোর্ড নেই। নদীর পাড়ে অবস্থানের কারণে ভাঙনের ঝুঁকিও রয়েছে। তাই দ্রুত পাড় সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
কুমিল্লা সামাজিক বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা জিএম মোহাম্মদ কবির জানান, পূর্বে একটি সাইনবোর্ড স্থাপন করা হলেও বর্তমানে সেটি অনুপস্থিত। শিগগিরই নতুন সাইনবোর্ড স্থাপন করা হবে। পাশাপাশি পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে সমন্বয় করে নদীভাঙন রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

