নির্বাচনী প্রচারণা শেষ হওয়ার আগেই অন্তত ৩৪ শতাংশ প্রার্থী নির্বাচনী ব্যয়সীমা অতিক্রম করেছেন। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাচনী পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশন (ইসি) প্রার্থীদের মাঠ থেকে নির্বাচনী প্রচারণা সামগ্রী অপসারণের নির্দেশ দিলেও ৮১.৩ শতাংশ প্রার্থী তা অমান্য করেছেন। সরকার ও ইসির সমন্বয়হীনতায় গণভোট নিয়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। পর্যবেক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়াও ‘অস্বচ্ছ ও বিতর্কিত’।
গতকাল রবিবার রাজধানীর ধানমণ্ডিতে টিআইবি অডিটরিয়ামে সংবাদ সম্মেলনে ‘প্রাক-নির্বাচন এবং গণভোট পরিস্থিতি : টিআইবির পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘নির্বাচনী সহিংসতার পাশাপাশি পতিত কর্তৃত্ববাদী শক্তির ঘোষিত নির্বাচনবিরোধী তৎপরতায় অস্থিতিশীলতার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সংখ্যালঘু, নারী, প্রতিবন্ধীসহ সব ভোটারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। ভোটের রায় মেনে নেওয়ার মানসিকতা থাকতে হবে। এ দায়িত্ব একদিকে যেমন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর, তেমনি রাজনৈতিক দলগুলোরও। তবেই শান্তিপূর্ণ ভোট সম্ভব।’
সংবাদ সম্মেলনে পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন টিআইবির গবেষক মো. মাহফুজুল হক।
তিনি বলেন, ‘নির্ধারিত সময়ের আগেই রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেন। প্রচারণার জন্য অনুমোদিত সময়ের আগেই দলগুলোর সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে। সার্বিকভাবে অন্তত ৩৪ শতাংশ প্রার্থী নির্বাচনী ব্যয়সীমা অতিক্রম করেছেন। ওই সব প্রার্থী গড়ে এক কোটি ১৯ লাখ ৬১ হাজার ৩১০ টাকা ব্যয় (৪ ডিসেম্বর ২০২৫ থেকে ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত) করেছেন।’
টিআইবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাঠ থেকে নির্বাচনী প্রচারণা সামগ্রী অপসারণে ইসির নির্দেশনা থাকলেও ৮১.৩ শতাংশ প্রার্থী তা অমান্য করেছেন।
প্রচারণাসামগ্রী অপসারণের নির্দেশ দেওয়ায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে ফোনে প্রার্থীরা হুমকি-ধমকিও দিয়েছেন।
প্রাক-নির্বাচন পর্যায়ে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও বিতর্কিত সিদ্ধান্তের কারণে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে বলে মনে করছে টিআইবি। প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, সক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ধারাবাহিক দুর্বলতার কারণে নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ন হয়েছে। পাশাপাশি আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনায় ৫৯ শতাংশ ভোটকেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হলেও সেসব এলাকায় কার্যকর প্রস্তুতির ঘাটতি রয়েছে।
পর্যবেক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়াকে ‘অস্বচ্ছ ও বিতর্কিত’ আখ্যা দিয়ে টিআইবি জানায়, নামসর্বস্ব এবং রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পর্যবেক্ষক নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে। ৮১টি সংস্থার অধীনে নিবন্ধিত ৫৫ হাজার ৪৫৪ জন পর্যবেক্ষকের মধ্যে ১৭টি সংস্থা থেকেই ৬৪ শতাংশ পর্যবেক্ষক নিয়োগ পেয়েছেন। এমনকি অফিস না থাকা একটি প্রতিষ্ঠান থেকে ১০ হাজারের বেশি পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
বিদেশি পর্যবেক্ষকদের ব্যয়ভার নির্বাচন কমিশনের বহনের সিদ্ধান্তকেও কর্তৃত্ববাদী আমলের চর্চার ধারাবাহিকতা হিসেবে সমালোচনা করেছে টিআইবি।
প্রার্থীর হলফনামা যাচাই নিয়েও নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ বলে মনে করছে টিআইবি। আয়-ব্যয়, দ্বৈত নাগরিকত্ব, বিদেশে সম্পদ ও ঋণসংক্রান্ত তথ্য নিয়ে অসংগতি প্রকাশ্যে এলেও সেগুলোর কার্যকর যাচাই হয়নি। অন্তত ৪৫ জন ঋণগ্রস্ত প্রার্থী আইনের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘নির্বাচনী কার্যক্রমের পুরনো রাজনৈতিক চর্চা বজায় রয়েছে। ফলে দল ও জোটের মধ্যে সংঘাত, অন্তঃকোন্দল, ক্ষমতার জন্য অসুস্থ প্রতিযোগিতা এবং সহিংসতা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। আগের মতোই রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা নির্বাচনে অর্থ, ধর্ম ও পেশিশক্তির ব্যবহার অব্যাহত রেখেছেন।’
এবারের নির্বাচনে ন্যূনতম ৫ শতাংশ নারীকে মনোনয়ন দেওয়ার কথা বলা হলেও কোনো দল সেটি করেনি।
টিআইবি বলেছে, অবাধ, নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও সবার জন্য প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি এবং শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজনে নির্বাচন কমিশন ও অন্যান্য অংশীজনের ক্রমবর্ধমান ঘাটতি দৃশ্যমান হচ্ছে। অনলাইন ও অফলাইন প্রচারণাসহ নির্বাচনের প্রায় প্রতিটি স্তরে দল ও প্রার্থীরা আচরণবিধি লঙ্ঘনসহ বিবিধ অনিয়ম করলেও কমিশন তা এড়িয়ে যাচ্ছে। নির্বাচন আয়োজনে সম্পৃক্ত সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে বিশেষ করে প্রশাসনিক ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যদের একাংশের মধ্যে অনিয়ম ও নিষ্ক্রিয়তা লক্ষ করা যাচ্ছে।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, সরকার ও ইসির অদূরদর্শী পদক্ষেপের ফলে গণভোট নিয়ে অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গণভোট পরিচালনার অর্থায়ন এবং ব্যয়ের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্ন। ইসি এ ক্ষেত্রে আইনের ভুল ব্যাখ্যার ওপর ভিত্তি করে নিষ্প্রয়োজনীয় ও বিতর্কিত পদক্ষেপ নিয়েছে।
দুর্নীতিকে ‘না’ বলুন, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বলুন—এমন মন্তব্য করে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, গণভোট নিয়ে সরকার ও ইসির সমন্বয়হীনতা বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলগুলোর বিপরীতমুখী অবস্থানের কারণে গণভোটের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সরকারের সিদ্ধান্তহীনতা দেখা যায়।
সরকারের প্রচারণা কার্যক্রম শুরু হওয়ার ১৮ দিন পর সরকারি কর্মচারীদের গণভোটের পক্ষে প্রচার সম্পর্কে যে নির্দেশনা ইসি দিয়েছিল তা কতটুকু আইনসম্মত ও গঠনমূলক, সেই প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে টিআইবি। সংস্থাটির মতে, এসব কারণে ‘হ্যাঁ’ ভোট নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।

