বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, জনগণের রায়ে বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত বিডিআর’র নাম পুনর্বহাল করা হবে। একই সঙ্গে ওয়ান র্যাঙ্ক, ওয়ান পে বাস্তবায়ন করা হবে এবং সেনাবাহিনীর সঙ্গে আলোচনা করে পিলখানার হত্যাকাণ্ডের দিনটিকে শহীদ সেনা দিবস, সেনা হত্যাযজ্ঞ দিবস অথবা জাতীয় শোক দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হবে।
শনিবার রাজধানীর রেডিসন ব্লু হোটেলে সশস্ত্র বাহিনীর সাবেক সদস্য ও তাদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আয়োজিত ‘স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের সুদৃঢ় আস্থা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন তিনি। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল সংসদ নির্বাচন-২০২৬ উপলক্ষে সশস্ত্র বাহিনী বিষয়ক উপকমিটি এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানে তারেক রহমান বলেন, ২০০৯ সালে পিলখানায় বিডিআর হত্যাকাণ্ডের পর পতিত, পরাজিত ও বিতাড়িত ফ্যাসিস্ট শক্তি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত বিডিআরের নাম পরিবর্তন করে দেয়। এমনকি তাদের পোশাকের রংও বদলে ফেলা হয়। এ প্রসঙ্গে তিনি ব্যক্তিগত অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, জনগণের রায়ে বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে ইনশাল্লাহ বিডিআরের ঐতিহ্যবাহী নাম পুনর্বহাল করা হবে।
তিনি বলেন, ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটে, সে লক্ষ্যে সেনাবাহিনীর সঙ্গে আলোচনা করে পিলখানায় সংঘটিত সেনা হত্যাকাণ্ডের দিনটিকে শহীদ সেনা দিবস, সেনা হত্যাযজ্ঞ দিবস অথবা জাতীয় শোক দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হবে।
বক্তব্যে তারেক রহমান জানান, অনুষ্ঠানের আগে সাবেক কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তা তার কাছে সেনাবাহিনীর জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ তুলে ধরেছেন। জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ গঠন, সেনা আইনের কিছু বিধিমালা পরিমার্জন বা সংস্কারসহ এসব সুপারিশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি মনে করেন।
তিনি বলেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে জনগণের রায়ে বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে সেনাবাহিনীর সাবেক ও বর্তমান সদস্যদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করা হবে। এই কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী দাবিদাওয়া যাচাই-বাছাই করে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হবে।
একই সঙ্গে ওয়ান র্যাঙ্ক, ওয়ান পে বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তারেক রহমান বলেন, এটি বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। জনগণের রায় পেলে যত দ্রুত সম্ভব এটি বাস্তবায়ন করা হবে।
সেনাবাহিনী সম্পর্কে ব্যক্তিগত অনুভূতি প্রকাশ করে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, সেনাবাহিনী তার কাছে একটি বৃহত্তর পরিবারের মতো। সেনানিবাসেই তার বেড়ে ওঠা। ছোট বয়সে পিতাকে হারানোর পর তিনি দেখেছেন, সেনাবাহিনীর প্রতি তার মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার গভীর আস্থা ও সম্মান ছিল। তার মা বিশ্বাস করতেন, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনী অপরিহার্য।
তারেক রহমান বলেন, সন্তান হিসেবে তিনি যেমন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে নিয়ে গর্বিত, তেমনি একজন সেনা কর্মকর্তা হিসেবে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে তিনি সেনাবাহিনীকেও গর্বিত করেছিলেন বলে তিনি বিশ্বাস করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতাপ্রিয় জনগণের কাছে শহীদ জিয়া একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে গর্বের প্রতীক বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, দেশের জনগণ সেনাবাহিনীকে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের নির্ভরযোগ্য প্রহরী হিসেবে বিবেচনা করে। সেনাবাহিনীকে ভিন্ন কাজে সম্পৃক্ত করা হলে তাদের মূল দায়িত্ব ব্যাহত হয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
গত দেড় দশকে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তারেক রহমান বলেন, দেশ যখন তাঁবেদার ও অপশক্তির কবলে পড়েছিল, তখন শুধু গণতন্ত্রই নয়, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বও হুমকির মুখে পড়ে। এমনকি পিলখানার পরিকল্পিত সেনা হত্যাকাণ্ডের দিনেও সেনাবাহিনী যথাযথ ভূমিকা রাখতে পারেনি বা রাখতে দেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, সেনাবাহিনীর গৌরব ফিরিয়ে দেওয়া যায় না, এটি অর্জন ও ধারণের বিষয়। সেনাবাহিনীর গৌরব সেনাবাহিনীকেই রক্ষা করতে হবে। নিজেদের সম্মান ও মর্যাদা সম্পর্কে সেনাবাহিনীর সদস্যদের সচেতন থাকতে হবে।
একজন রাজনৈতিক দলের নেতা হিসেবে তিনি আশ্বাস দেন, জনগণের রায়ে বিএনপি সরকার গঠন করলে সেনাবাহিনীকে কোনো রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। অতীতেও বিএনপি এমন কোনো কাজ করেনি এবং ভবিষ্যতেও করবে না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
অনুষ্ঠানে মেজর (অব.) মিজানুর রহমান উপস্থিত অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, আগামী নির্বাচনে জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে তারেক রহমানকে সমর্থন দেবেন। তিনি গণতান্ত্রিক পথ বেছে নেওয়ার আহ্বান জানান।
তারেক রহমানকে উদ্দেশ করে মেজর (অব.) মিজানুর রহমান বলেন, গত ১৭ বছরে তিনি যে নিপীড়ন ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। গুলশানের বাসা থেকে স্ত্রী-সন্তানের সামনে তাকে তুলে নেওয়ার ঘটনার ট্রমা এখনো কাটেনি বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তিনি একটি নিরাপদ বাংলাদেশের প্রত্যাশা ব্যক্ত করে বলেন, তারেক রহমান দৃঢ় থাকলে প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারবেন বলে তিনি বিশ্বাস করেন।
অনুষ্ঠানে বিএনপি চেয়ারম্যানের প্রতিরক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর স্বাগত বক্তব্য দেন। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের এডিসি কর্নেল (অব.) হারুনুর রশিদ খান, মেজর (অব.) জামাল হয়দার, বিডিআরের সাবেক মহাপরিচালক (ডিজি) মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদের সন্তান রাকিন আহমেদসহ আরও অনেকে।

