ইরানের এক মিসাইলেই বদলে যাবে যুদ্ধের সমীকরণ?

0
ইরানের এক মিসাইলেই বদলে যাবে যুদ্ধের সমীকরণ?

ইরানের সমরশক্তিতে নতুন মাইলফলক হিসেবে যুক্ত হওয়া খোররামশাহর-৪ (খাইবারব্যালিস্টিক) ক্ষেপণাস্ত্র মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক ও সামরিক সমীকরণে বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস দিচ্ছে। সম্প্রতি ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী আইআরজিসি তাদের বিশাল ভূগর্ভস্থ ‘ক্ষেপণাস্ত্র নগরী’ থেকে এই অত্যাধুনিক মারণাস্ত্রটির প্রদর্শনী করার পর আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে আলোচনার ঝড় উঠেছে। 

বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষেপণাস্ত্রটি কেবল একটি অস্ত্র নয় বরং এটি ইরানের সামরিক কৌশলের একটি নতুন স্তরের প্রতিফলন। যা মূলত আঞ্চলিক প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করে তুলেছে। মাটির গভীরে সুরক্ষিত পরিকাঠামোয় এই ক্ষেপণাস্ত্রের অবস্থান একে শত্রুপক্ষের আগাম হামলা থেকে সুরক্ষিত রেখেছে। যেকোনো পরিস্থিতিতে দ্রুত পাল্টা আঘাত হানার সক্ষমতা নিশ্চিত করতেই এই উদ্যোগ। ফলে ইরানের ওপর কোনো সামরিক আগ্রাসন চালানোর আগে যেকোনো পক্ষকে এখন দশবার ভাবতে হবে, কারণ এই সিস্টেমটি প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও কার্যকর থাকার মতো করেই তৈরি করা হয়েছে।

কারিগরি দিক থেকে বিচার করলে খোররামশাহর-৪ ইরানের এযাবৎকালের অন্যতম শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র। প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার পাল্লার এই ক্ষেপণাস্ত্রটির সবচেয়ে ভীতিজাগানিয়া দিক হলো এর গতি এবং ধ্বংসক্ষমতা। বায়ুমণ্ডলের বাইরে এর গতি শব্দের গতির চেয়ে ১৬ গুণ বেশি এবং বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের পর তা প্রায় ৮ গুণ গতিতে লক্ষ্যবস্তুর দিকে ধাবিত হয়। মাত্র ১০ থেকে ১২ মিনিটের মধ্যে এটি তার নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছাতে সক্ষম, যা প্রতিপক্ষের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য সতর্ক হওয়ার বা পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার সময়কে প্রায় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনে। এর বিশাল ১,৫০০ কেজি ওজনের ওয়ারহেড বা যুদ্ধাশ্রু ইরানের সংগ্রহে থাকা যেকোনো ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় অনেক বেশি ধ্বংসাত্মক। আধুনিক ‘আরভান্দ’ ইঞ্জিনের ব্যবহার এবং জ্বালানি ট্যাঙ্কের ভেতরে ইঞ্জিনের বিশেষ সংস্থাপন ক্ষেপণাস্ত্রটির দৈর্ঘ্য কমিয়ে স্থায়িত্ব বাড়িয়েছে, যা একে আরও নিখুঁতভাবে লক্ষ্যভেদে সহায়তা করে।

এই ক্ষেপণাস্ত্রের আরেকটি বৈপ্লবিক বৈশিষ্ট্য হলো ম্যানুভারেবল রিঅ্যান্ট্রি ভেহিকেল (এমএআরভি) প্রযুক্তি। বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের শেষ পর্যায়ে এটি নিজের গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে এবং আটটি ছোট ইঞ্জিনের সাহায্যে স্থিতিশীলতা বজায় রাখে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, চূড়ান্ত পর্যায়ে এটি কোনো ইলেকট্রনিক নির্দেশনার ওপর নির্ভর করে না। ফলে শত্রুপক্ষের ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার বা জ্যামিং প্রযুক্তি একে বিভ্রান্ত করতে পারে না। প্রচলিত ডানা বা ফিন বাদ দিয়ে থ্রাস্ট ভেক্টর কন্ট্রোল ব্যবহারের ফলে এর রাডার সিগনেচারও অনেক কম। ফলে রাডারে এটিকে শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব করে তোলে। ৩০ মিটারেরও কম সার্কুলার এরর প্রোবাবল (সিইপি) থাকার কারণে এটি অত্যন্ত নির্ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে।

কৌশলগতভাবে খোররামশাহর-৪ উন্মোচনের সময়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। যখন আমেরিকা ও ইসরায়েলের পক্ষ থেকে ইরানকে বিভিন্নভাবে চাপে রাখার চেষ্টা চলছে। ঠিক তখনই এই শক্তির প্রদর্শন ইরানের ‘সক্রিয় প্রতিরোধ’ নীতিরই অংশ। 

ইরান স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে, তারা কোনো দুর্বল অবস্থান থেকে কূটনৈতিক আলোচনা করতে আগ্রহী নয়। ক্ষেপণাস্ত্রটির দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি সংরক্ষণ ক্ষমতা এবং মাত্র ১৫ মিনিটের মধ্যে উৎক্ষেপণের প্রস্তুতি নেওয়ার সক্ষমতা একে একটি স্থায়ী রণপ্রস্তুতির হাতিয়ারে পরিণত করেছে। একক ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে একাধিক পয়েন্টে আঘাত হানার ক্ষমতা যেকোনো প্রতিরক্ষা ব্যুহকে মুহূর্তেই গুঁড়িয়ে দেওয়ার সামর্থ্য রাখে। সামগ্রিকভাবে, খোররামশাহর-৪ কেবল একটি প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ নয় বরং এটি আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্যকে এমন এক জায়গায় নিয়ে গেছে যেখানে ইরানের বিরুদ্ধে যেকোনো সামরিক অ্যাডভেঞ্চারের মূল্য হবে আকাশচুম্বী। এই ক্ষেপণাস্ত্রটি এখন ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক সক্ষমতার একটি অবিচ্ছেদ্য স্তম্ভ হিসেবে দাঁড়িয়েছে যা সরাসরি মধ্যপ্রাচ্যের আগামীর যুদ্ধ সমীকরণ নিয়ন্ত্রণ করবে।

সূত্র: তেহরান টাইমস

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here