যৌনাঙ্গে আক্রান্তকারী পরজীবী দেশে দেশে ছড়াতে পারে

0
যৌনাঙ্গে আক্রান্তকারী পরজীবী দেশে দেশে ছড়াতে পারে

এটি এমন এক পরজীবী, যা ত্বকের ভেতর দিয়ে শরীরে ঢুকে রক্তে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থাকে। নীরবেই এটি ডিম পাড়ে, আর এসব ডিম জমা হয় মানবদেহের লিভার, ফুসফুস ও যৌনাঙ্গে।

অনেক সময় বছরের পর বছর ধরে মানুষের শরীরে এই পরজীবীর উপস্থিতি থাকলেও তা ধরা না-ও পড়তে পারে।

এই পরজীবীর সংক্রমণ স্নেইল ফিভার নামে পরিচিত।

স্নেইল বা শামুক এই পরজীবী বহন করার কারণেই এই নামকরণ। এই রোগের বিষয়ে মানুষের জানাশোনা অনেক কম।

কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো এই পরজীবী সংক্রমিত রোগ ক্রমেই বদলাচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে শক্তিশালী হচ্ছে।

বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, অলক্ষ্যে থাকা এই পরজীবীর সংক্রমণ এমনভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে, ভবিষ্যতে এটি নিয়ন্ত্রণ করা বেশ কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

প্রতিবছর এই রোগের জন্য চিকিৎসা নেন বিশ্বের প্রায় ২৫ কোটি মানুষ। যাদের বেশির ভাগই আফ্রিকা মহাদেশে বাস করে। কারণ যেসব শামুক এই পরজীবী বহন করে, সেগুলো মূলত আফ্রিকায়ই পাওয়া যায়।

তবে বিশ্বজুড়ে ৭৮টি দেশে এই রোগের সংক্রমণের ঘটনা পাওয়া গেছে।

এর মধ্যে চীন, ভেনেজুয়েলা ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশও রয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে, বিষয়টি এখন একটি বৈশ্বিক উদ্বেগে পরিণত হয়েছে।

সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, পরজীবীটির গঠন ও বৈশিষ্ট্যে এমন সব পরিবর্তন এসেছে, এটি নতুন নতুন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

এই সতর্কবার্তাটি এসেছে এমন এক সময়, যখন ৩০ জানুয়ারি ওয়ার্ল্ড নেগলেক্টেড ট্রপিক্যাল ডিজিজ ডে পালন করছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

এই দিবসের লক্ষ্য হলো ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, পরজীবী ও ছত্রাকজনিত রোগগুলোর দিকে দৃষ্টি দেওয়া, যেগুলো মূলত দরিদ্র অঞ্চলে বসবাসকারী ১০০ কোটির বেশি মানুষকে আক্রান্ত করে।

এই পরজীবী বহন করে বিশেষ ধরনের শামুক। এই শামুক যে পানিতে থাকে, সেখানে এই পরজীবীর লার্ভা পানিতে ছড়িয়ে পড়ে।

এখন কোনো মানুষ বা প্রাণী যদি কোনোভাবে সেই পানির সংস্পর্শে আসে বা গোসল করতে নামে, তখন তার স্নেইল ফিভার হতে পারে। এই লার্ভাগুলোতে চামড়া গলিয়ে ফেলার মতো এনজাইম ছাড়ে এবং ত্বকের ভেতর দিয়ে শরীরে ঢুকে পড়ে।

এরপর এগুলো ধীরে ধীরে মানুষের শরীরের ভেতরে বড় হয়ে পূর্ণবয়স্ক কৃমিতে পরিণত হয় এবং রক্তনালিতে বসবাস শুরু করে। স্ত্রী কৃমিগুলো ডিম পাড়ে।

এই ডিমগুলোর কিছু মল বা প্রস্রাবের সঙ্গে শরীর থেকে বেরিয়ে যায়। তবে অনেক ডিম শরীরের ভেতরের টিস্যুতে আটকে যায়।

শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা সেগুলো ধ্বংস করতে গিয়ে আশপাশের সুস্থ টিস্যুকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। এতে বিভিন্ন অঙ্গের ক্ষতি হতে পারে।

কিছু ডিম তলপেট ও যৌনাঙ্গের আশপাশে আটকে যায়। এই অবস্থাকে বলা হয় ইউরোজেনিটাল স্কিস্টোসোমিয়াসিস। এই রোগে পেটব্যথা থেকে শুরু করে ক্যান্সার এবং মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

স্নেইল ফিভার সাধারণত অ্যান্টি-প্যারাসাইটিক ওষুধে সেরে যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ঝুঁকিপূর্ণ মানুষ, যেমন ছোট শিশু, কৃষি শ্রমিক ও জেলেদের কয়েক বছর ধরে পরামর্শ দিয়ে আসছেন তাঁরা যেন প্রতিবছর এই ওষুধ খায়।

তবে মালাউই লিভারপুল ওয়েলকাম ক্লিনিক্যাল রিসার্চ প্রোগ্রামের সহযোগী পরিচালক অধ্যাপক জানেলিসা মুসায়াসহ অন্য বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই পরজীবীর নতুন কিছু ধরন পাওয়া গেছে, যেগুলো প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতিতে ধরা না-ও পড়তে পারে।

গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের শরীরে থাকা পরজীবী আর প্রাণীর শরীরে থাকা পরজীবী একে অপরের সঙ্গে মিলিত হয়ে নতুন ‘হাইব্রিড (মিশ্র)’ ধরন তৈরি করছে।

এই হাইব্রিড পরজীবীগুলো মানুষ ও প্রাণী উভয়কেই আক্রান্ত করতে পারে। ফলে রোগের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা আরো কঠিন হয়ে যাচ্ছে।

বিজ্ঞানীরা আগে থেকেই জানতেন যে, মানুষ ও প্রাণীর শরীরের পরজীবীগুলো একে অপরের সঙ্গে প্রজনন করছে। কিন্তু তারা নিশ্চিত ছিলেন না, এই হাইব্রিড ডিমগুলো শরীরের বাইরে টিকে থাকতে ও বেঁচে থাকতে পারছে কি না।

এটা প্রমাণ করতে গবেষকরা মালাউইর কিছু নির্দিষ্ট এলাকার মানুষ ও প্রাণীর কাছ থেকে নমুনা নেন। তাঁরা দেখেন, এসব পরজীবীর ৭ শতাংশই ছিল পরিবর্তিত হাইব্রিড, যা তাদের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি। এর মানে হলো এই নতুন পরজীবীগুলো সফলভাবে বংশবিস্তার করছে এবং ভবিষ্যতে আরো ছড়িয়ে পড়বে। বিবিসিকে অধ্যাপক মুসায়া বলেন, ‘প্রকৃতিতে যদি এভাবে সংক্রমণ চলতেই থাকে, তাহলে সংখ্যাটা অনেক বড় হয়ে যাবে।’

তিনি সতর্ক করেছেন, যেহেতু গবেষণা শুধু কিছু নির্দিষ্ট এলাকায় করা হয়েছে, তাই এটা হয়তো ‘হিমশৈলের চূড়া মাত্র, আসল সমস্যা আরো বড় হতে পারে। বিশেষ করে, অনেক সময় পরীক্ষায় এই সংক্রমণ ধরাই পড়ছে না।

ভবিষ্যতে এই হাইব্রিড পরজীবীগুলো পুরনো পরজীবীদেরও হারিয়ে দিতে পারে বলে সতর্ক করছেন তিনি। তখন এটা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারে। কারণ চিকিৎসকরা এখনো নিশ্চিত নন, এই হাইব্রিড পরজীবী বহন করা রোগীদের কিভাবে চিকিৎসা করতে হবে।

অধ্যাপক মুসায়া বলেন, ‘নীতিনির্ধারকদের প্রতি আমাদের একটা বার্তা—জেগে উঠুন। বড় সমস্যা হওয়ার আগেই কি আমরা দ্রুত কিছু করতে পারি না?’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here