ভাঙনের মুখে ইরান, আরও বড় ধাক্কা আসছে?

0
ভাঙনের মুখে ইরান, আরও বড় ধাক্কা আসছে?

ইরান বর্তমানে এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর দেশটির শাসনব্যবস্থা সম্ভবত তাদের সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছে। সাম্প্রতিক সময়ে মুদ্রাস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের জেরে গড়ে ওঠা গণবিক্ষোভ দেশটির নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে চরম চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে। 

যদিও কঠোর হাতে দমন-পীড়নের মাধ্যমে তেহরান আপাতত রাজপথ শান্ত করতে সক্ষম হয়েছে, কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে এই শান্তি কেবল সাময়িক। ভেতরে ভেতরে জ্বলতে থাকা ক্ষোভ যেকোনো সময় আবারও দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ার অপেক্ষায় রয়েছে। 

গত ডিসেম্বরে মুদ্রার মান পড়ে যাওয়ার প্রতিবাদে শুরু হওয়া আন্দোলন দ্রুতই সরকার পতনের ডাক দিয়ে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। সরকারি হিসেবে এই সংঘাত কয়েক হাজার মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে, যা কয়েক দশকের মধ্যে দেশটির সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।

ইরানের এই সংকটের মূলে রয়েছে কয়েক দশকের আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, অব্যবস্থাপনা এবং দুর্নীতি। বর্তমানে দেশটির সাধারণ নাগরিকরা কেবল আকাশচুম্বী মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গেই লড়ছেন না, বরং বিদ্যুৎ ও সুপেয় পানির তীব্র সংকটের মধ্যে জীবন অতিবাহিত করছেন।

২০১৬ সালে পারমাণবিক চুক্তির সময় যে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার আশা তৈরি হয়েছিল, ট্রাম্প প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা পুনঃআরোপের পর তা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে। এই দুরবস্থা থেকে উত্তরণে ইরানের সামনে এখন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে নতুন করে কোনো চুক্তিতে আসা ছাড়া বিকল্প পথ নেই বললেই চলে। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে তেহরানের জন্য পথটা আরও বন্ধুর হয়ে উঠেছে। মার্কিন প্রশাসন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, কেবল পারমাণবিক কর্মসূচি নয় বরং ব্যালিস্টিক মিসাইল এবং আঞ্চলিক প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ কমালেই মিলবে নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি।

আঞ্চলিক রাজনীতির সমীকরণও এখন ইরানের প্রতিকূলে। গত বছর ইসরায়েলের সাথে সরাসরি সংঘাত এবং হিজবুল্লাহর মতো ঘনিষ্ঠ মিত্রদের শক্তি হ্রাস পাওয়ায় তেহরানের চিরাচরিত ‘ফরোয়ার্ড ডিফেন্স’ কৌশল বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। সিরিয়ায় আসাদ সরকারের পতন এবং ইরাকের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তন ইরানকে এক প্রকার নিঃসঙ্গ করে তুলেছে। দেশের অভ্যন্তরেও শাসনের বৈধতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে। এতদিন সামাজিক ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিনিময়ে রাষ্ট্র নাগরিকদের নিরাপত্তার গ্যারান্টি দিত, কিন্তু ইসরায়েলের সরাসরি হামলায় সেই গ্যারান্টিও এখন ফিকে হয়ে গেছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরানের বর্তমান শাসনকাঠামো ধীরে ধীরে ধর্মীয় নেতৃত্ব থেকে একটি সামরিক নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছে, যেখানে রেভল্যুশনারি গার্ডের প্রভাবই হবে সর্বেসর্বা।

সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ভাষণে ডোনাল্ড ট্রাম্প আলোচনার ইঙ্গিত দিলেও পারস্য উপসাগরে মার্কিন রণতরীর উপস্থিতি তেহরানের ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করছে। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনির উত্তরসূরি নির্বাচনের প্রশ্নটি সামনে এলে ইরানের এই সংকট আরও ঘনীভূত হবে। সংস্কার হোক কিংবা শাসন ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন, ইরানে পরিবর্তনের ঢেউ এখন অনিবার্য হয়ে উঠেছে। রাষ্ট্র যদি দ্রুত অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংস্কারের পথে না হাঁটে, তবে এই অস্থিরতা অচিরেই রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি নাড়িয়ে দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সূত্র: আল জাজিরা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here