একদিকে যার অসীম সৌন্দর্য আর অন্যদিকে প্রকৃতির রুদ্ররূপ। ভারত ও বাংলাদেশের সীমান্ত ঘেঁষে থাকা বিশ্বের এই বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ অরণ্য যেমন বিপন্ন প্রজাতির বেঙ্গল টাইগারের আবাসস্থল, তেমনই এখানকার সাধারণ মানুষের জীবনের প্রতিটি বাঁকে মিশে আছে আতঙ্ক। গত এক দশকে এই জঙ্গলেই মাছ ধরতে গিয়ে বাঘের কবলে প্রাণ হারিয়েছেন অসংখ্য মৎস্যজীবী। কিন্তু যাদের স্বামীরা বাঘের আক্রমণে প্রাণ হারিয়েছেন, সেই ‘বাঘ বিধবা’রা এখন এক অনন্য বিপ্লবের নায়ক। সমাজের গঞ্জনা আর দারিদ্র্যকে জয় করে তারা এখন সেই জঙ্গলকেই পুনর্জীবিত করছেন, যা একসময় তাদের সবটুকু কেড়ে নিয়েছিল।
সুন্দরবনের ঝাড়খালি সংলগ্ন মাতলা নদীর তীরে এই অভিনব উদ্যোগ শুরু হয়েছে। আই-বিহাইন্ড দ্য ইঙ্ক এবং কনজারভেশন ইন্টারন্যাশনালের মতো সংস্থার সহায়তায় স্থানীয় নারীরা গড়ে তুলছেন ম্যানগ্রোভের সবুজ দেয়াল। মালতী মণ্ডলের মতো নারীরা, যাদের স্বামীরা ১০ বছর আগে বাঘের থাবায় প্রাণ হারিয়েছেন, তারা এখন দিনরাত এক করে চারা রোপণ করছেন। এই প্রকল্পের আওতায় ১০০ হেক্টর জমিতে প্রায় এক লক্ষ ম্যানগ্রোভ চারা রোপণের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে।
সুন্দরবনের এই গভীর অরণ্যে বাঘ আর মানুষের লড়াই নতুন কিছু নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বন সংকুচিত হওয়ায় বাঘেরা লোকালয়ের কাছাকাছি চলে আসছে। আর পেটের দায়ে মানুষ গভীর জঙ্গলে গিয়ে বাঘের পেটে যাচ্ছে। কিন্তু মালতীদের মতো নারীদের লড়াইটা ছিল দ্বিমুখী। স্বামীকে হারানোর পর সামাজিকভাবে তাদের ‘স্বামী খেকো’ বা অলক্ষ্মী অপবাদ সইতে হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বনের নিষিদ্ধ এলাকায় মাছ ধরতে যাওয়ায় সরকারি সাহায্য থেকেও বঞ্চিত হয়েছেন তারা।
বর্তমানে এই নারীরা নার্সারিতে চারা তৈরি থেকে শুরু করে নদীর পাড়ে চারা রোপণ পর্যন্ত সব কাজই করছেন। এই কাজের বিনিময়ে তারা যে পারিশ্রমিক পাচ্ছেন, তা দিয়ে তাদের সংসার চলছে, সন্তানদের পড়ালেখার খরচ জোগানো যাচ্ছে। এর ফলে তাদের হারানো মর্যাদা যেমন ফিরে আসছে, তেমনই সংরক্ষিত হচ্ছে প্রকৃতি।
ঝাড়খালির বিস্তীর্ণ এলাকা বর্তমানে সমুদ্রের পানির স্তর বৃদ্ধি এবং ঘূর্ণিঝড়ের আশঙ্কায় থাকে। ম্যানগ্রোভের এই ঘন জঙ্গল শুধু বাঘের জন্যই নিরাপদ আবাসস্থল ব্যবস্থা করবে না। বরং শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় আর জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষা করবে উপকূলের গ্রামগুলোকে। বন যত ঘন হবে, মাছের সংখ্যা তত বাড়বে, ফলে খাবারের সন্ধানে বাঘকে আর লোকালয়ে আসতে হবে না। মানুষকেও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গহিন বনে যেতে হবে না।
এই উদ্যোগটি হিমালয় থেকে সুন্দরবন পর্যন্ত বিস্তৃত ‘মাউন্টেন টু ম্যানগ্রোভ’ নামক একটি বিশাল পরিকল্পনার অংশ। উদ্যোক্তারা মনে করেন, এটি কেবল পরিবেশ রক্ষার লড়াই নয় এটি প্রান্তিক নারীদের আত্মসম্মান রক্ষার লড়াই। যে বিধবাদের একসময় সমাজ অচ্ছুত করে রেখেছিল, আজ তারাই হয়ে উঠেছেন সুন্দরবনের প্রধান রক্ষাকর্তা। মালতী ও তার সঙ্গীদের হাতে বোনা প্রতিটি চারা গাছ এখন সুন্দরবনের অনিশ্চিত ভবিষ্যতে আশার আলো দেখাচ্ছে। তাদের এই নিরলস পরিশ্রম বলে দিচ্ছে যে, ধ্বংসের বুক থেকেই নতুনের সৃষ্টি হয়।
সূত্র: সিএনএন

