তোপের মুখে এ আর রহমান: তাকে খারিজ করার আগে পুরো সাক্ষাৎকারটি শুনুন

0
তোপের মুখে এ আর রহমান: তাকে খারিজ করার আগে পুরো সাক্ষাৎকারটি শুনুন

অস্কারজয়ী সুরকার ও সংগীতশিল্পী এ আর রহমানের একটি মন্তব্য ঘিরে বিতর্ক চলছে ভারতে। বিজেপিপন্থী অনেকেই এই সঙ্গীতঙ্গকে তোপ দাগছেন। কিন্তু কেন, কি ঘটেছে আদতে? জানা যায়, ঘটনার সূত্রপাত এ আর রহমানের সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকার ঘিরে। সেখানে অস্কারজয়ী সুরকার অভিযোগ করেন, গত আট বছরে তিনি বহু কাজ হারিয়েছেন। এর পেছনে বলিউডের অন্দরে থাকা কুসংস্কার ও ধর্মীয় বিভাজনকে দায়ী করেন এই সুরকার। এ আর রহমান বলেন, ‘গত আট বছরে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর থেকে এসব ঘটছে। কারণ, ক্ষমতা এখন এমন কিছু মানুষের হাতে, যারা সৃজনশীল নন। আবার ধর্মীয় বিভাজনও এর একটি কারণ হতে পারে। তবে এগুলো কেউ সরাসরি আমার মুখের ওপর বলেনি।’ কারও নাম না নিলেও এ আর রহমানের মন্তব্যে রাজনৈতিক দল বিজেপির দিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে বলে মনে করছেন অনেকেই। আর তাতেই ক্ষুব্ধ হয়েছেন বিজেপি ঘেঁষা জনগোষ্ঠী। আর সেই প্রেক্ষাপটে একটি মন্তব্য কলার লিখেছেন গালফ নিউজের এন্টারটেইনমেন্ট, লাইফস্টাইল ও স্পোর্ট এডিটর মঞ্জুষা রাধাকৃষ্ণান। 

মঞ্জুষা লিখেছেন, ‘আমার ১৯ বছরের ক্যারিয়ারে আমি অস্কার বিজয়ী সংগীত পরিচালক এবং ভারতের অন্যতম বড় সাংস্কৃতিক দূত এ আর রহমানের সাক্ষাৎকার বেশ কয়েকবার নিয়েছি। আমি যদি পরম নিশ্চয়তার সাথে একটি কথা বলতে পারি, তবে তা হলো রহমান আমার দেখা এমন একজন শিল্পী যিনি সবথেকে পরিমিত উত্তর দেন।

তিনি সতর্ক। চিন্তাশীল। প্রায় যন্ত্রণাদায়কভাবে সুনির্দিষ্ট। তার টিম সবসময় তাকে ঘিরে থাকে, তার প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি বিরতি এবং কণ্ঠের প্রতিটি সুরের ওপর নজর রাখে; এটা নিশ্চিত করতে যে তিনি ঠিক ততটুকুই বলছেন যতটুকু তিনি বলতে চেয়েছেন।

এমনকি ফটোগ্রাফার তাকে কোন অ্যাঙ্গেল থেকে শুট করছেন, তা নিয়েও রহমান অত্যন্ত খুঁতখুঁতে। তিনি অবিশ্বাস্য রকমের পুঙ্খানুপুঙ্খ এবং তার মুখ থেকে বের হওয়া কোনো কথাই অনিচ্ছাকৃত বা দুর্ঘটনাবশত নয়।

তাই তার সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারটি নিয়ে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো বা খণ্ডিত ক্ষোভ প্রকাশের আগে আমার একটি অনুরোধ রাখুন: বিবিসি এশিয়ান নেটওয়ার্কে হারুন রশিদের দেওয়া ৮৬ মিনিট ২৬ সেকেন্ডের সম্পূর্ণ সাক্ষাৎকারটি দেখুন।

পূর্ণ তথ্য প্রকাশ করছি: হারুন এবং আমি আইফা অ্যাওয়ার্ডসে একসাথে সময় কাটিয়েছি। সে অত্যন্ত দায়িত্বশীল সাংবাদিকদের মধ্যে একজন; এমন একজন যে মন দিয়ে শোনে, গভীরে গিয়ে প্রশ্ন করে এবং প্রসঙ্গের গুরুত্ব বোঝে। এটি কোনো ‘ফাঁদে ফেলার’ মতো সাক্ষাৎকার ছিল না। এটি ছিল একটি প্রাণবন্ত কথোপকথন।

তিনি সেখানে যা নিয়ে কথা বলছিলেন (অত্যন্ত স্পষ্টভাবে) তা হলো কীভাবে বলিউডের সংগীতের জগত পরিবর্তিত হয়েছে এবং কীভাবে বর্তমান ক্ষমতা এমন কিছু মানুষের হাতে রয়েছে যারা সংগীত, এর প্রক্রিয়া বা এর সাংস্কৃতিক গুরুত্ব হয়তো পুরোপুরি বোঝেন না। এই হতাশা নতুন কিছু নয় এবং এটি বিতর্কিতও নয়; যদি না আপনি ইচ্ছাকৃতভাবে অন্য কিছু শোনার জন্য বদ্ধপরিকর হন।

হ্যাঁ, অতীতে তিনি হয়তো সাম্প্রদায়িক বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। কিন্তু সেই অংশটি? সেটি মূলত কানাঘুষা বা গুজব। তিনি হয়তো সেদিকে ইঙ্গিত করেছেন, কিন্তু আপনি যদি সম্পূর্ণ প্রেক্ষাপটসহ তার উত্তরটি শোনেন, তবে বুঝতে পারবেন রহমান অবিশ্বাস্য রকমের কূটনৈতিক ছিলেন, এমনকি সেটি প্রয়োজনের চেয়েও বেশি।

কিন্তু তিনি যা করেছেন তা হলো একটি স্পর্শকাতর জায়গায় আঘাত করা। কুসংস্কার সবখানেই আছে। এমনকি আমাদের নিজেদের কর্মক্ষেত্রে এবং ব্যক্তিগত জীবনেও। এবং এটি অস্বীকার করার ভান করা আমাদের প্রগতিশীল করে তোলে না বরং আমাদের অসৎ প্রমাণ করে।

রহমান একটি বৃহত্তর এবং অনেক বেশি শক্তিশালী পয়েন্ট তুলে ধরেছিলেন, যা অনেকে উপেক্ষা করতে বদ্ধপরিকর বলে মনে হচ্ছে। তিনি বলেছেন যে, রণবীর কাপুরের সাথে তার আসন্ন প্রজেক্ট রামায়ণ কীভাবে হ্যান্স জিমার (একজন ইহুদি সুরকার) এবং তাকে (হিন্দু পরিবারে জন্ম নেওয়া একজন সংগীতশিল্পী যিনি ইসলাম গ্রহণ করেছেন) একত্রিত করেছে; যেখানে তারা একটি ভারতীয় পৌরাণিক মহাকাব্য রামায়ণ-এ একসাথে কাজ করছেন। এটি যদি পরিচয়কে ছাপিয়ে শিল্পের জয়গানের এক অনন্য উদাহরণ না হয়, তবে আর কী?

আমার আবেদন খুবই সাধারণ; সবকিছু প্রেক্ষাপট অনুযায়ী দেখুন। পুরোপুরি শুনুন। শুধু ক্ষোভ প্রকাশের খাতিরে খণ্ডিত ক্ষোভ প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকুন। এ আর রহমান কোনো বিতর্ক উসকে দিচ্ছিলেন না। তিনি সবসময় যা করেন তাই করছিলেন সতর্কভাবে, কূটনৈতিকভাবে এবং যে পৃথিবীতে তিনি কাজ করেন সেই পৃথিবী সম্পর্কে গভীর সচেতনতা নিয়ে কথা বলছিলেন।

আর মাঝেমধ্যে এই সচেতনতাই মানুষকে অস্বস্তিতে ফেলার জন্য যথেষ্ট।’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here