কেন ফিনল্যান্ড থেকে আইসব্রেকার কিনছে যুক্তরাষ্ট্র?

0
কেন ফিনল্যান্ড থেকে আইসব্রেকার কিনছে যুক্তরাষ্ট্র?

গ্রিনল্যান্ড দখলে নেওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বারবার জোর দিয়ে বলছেন যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ডের মালিকানা দরকার। এ নিয়ে চরম উদ্বেগ দেখা দিয়েছে ইউরোপজুড়ে।

এরই মধ্যে আর্কটিক অঞ্চল নিয়ে তার বিস্তৃত কৌশলের অংশ হিসেবে ওয়াশিংটন নতুন আইসব্রেকার জাহাজের অর্ডার দিয়েছে। এ ধরনের জাহাজ তৈরির জন্য যুক্তরাষ্ট্র দ্বারস্থ হয়েছে বিশ্বের শীর্ষ বিশেষজ্ঞ দেশ ফিনল্যান্ডের। জমাট বাঁধা কঠিন বরফের মধ্য দিয়ে চলতে পারে এ জাহাজ। 

ফিনল্যান্ডের রাজধানী হেলসিঙ্কিতে অবস্থিত আকার আর্কটিক টেকনোলজির বরফ গবেষণাগারের ভেতরে তাপমাত্রা শূন্যের নিচে। সেখানে একটি আইসব্রেকারের ক্ষুদ্র মডেল ৭০ মিটার দীর্ঘ পরীক্ষামূলক ট্যাঙ্কে চলাচল করছে। জাহাজটি পানির জমাট পৃষ্ঠ ভেঙে সুন্দর একটি পথ তৈরি করে এগিয়ে যাচ্ছে। এটি ফিনল্যান্ডের পরবর্তী প্রজন্মের আইসব্রেকার নকশার পরীক্ষা। বরফ-কার্যক্ষমতা প্রকৌশলী রিয়িকা মাতালা বলেন, জাহাজের কাঠামোগত শক্তি ও ইঞ্জিনের ক্ষমতা যথেষ্ট হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী মিকা হোভিলাইনেন যোগ করেন, জাহাজের আকৃতিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তার ভাষায়, এ ধরনের হাল দরকার যা বরফকে নিচের দিকে বাঁকিয়ে ভাঙবে- এটা কাটা বা চেরা নয়।

আইসব্রেকার নির্মাণে ফিনল্যান্ড বিশ্বে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। বর্তমানে চালু থাকা সব আইসব্রেকারের প্রায় ৮০ শতাংশের নকশা ফিনিশ কোম্পানির, আর ৬০ শতাংশ নির্মিত হয়েছে ফিনল্যান্ডের শিপইয়ার্ডে। 

ফিনল্যান্ডের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান আর্টিকার প্রধান নির্বাহী মাউনু ভিসুরি বলেন, এই নেতৃত্ব এসেছে বাস্তব প্রয়োজন থেকেই। ফিনল্যান্ডই পৃথিবীর একমাত্র দেশ, যেখানে শীতকালে সব বন্দর জমে যেতে পারে। দেশের আমদানি করা পণ্যের ৯৭ শতাংশই আসে সমুদ্রপথে। শীতের কঠিন মাসগুলোতে আইসব্রেকারগুলো বন্দর খোলা রাখে এবং বড় কার্গো জাহাজের জন্য পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করে। ভিসুরি বলেন, এটা ফিনল্যান্ডের জন্য একেবারে প্রয়োজনীয় বিষয়।

আমরা বলি- ফিনল্যান্ড আসলে এক দ্বীপ। এই দক্ষতার কারণেই গত অক্টোবরে ট্রাম্প ঘোষণা দেন যে, যুক্তরাষ্ট্র উপকূলরক্ষী বাহিনীর জন্য ফিনল্যান্ড থেকে চারটি আইসব্রেকার অর্ডার করবে। আরও সাতটি জাহাজ যুক্তরাষ্ট্রেই নির্মিত হবে- ফিনিশ নকশা ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে। যুক্তরাষ্ট্র এগুলোকে ‘আর্কটিক সিকিউরিটি কাটার’ নামে অভিহিত করছে। 

ট্রাম্প বলেছিলেন, আমরা বিশ্বের সেরা আইসব্রেকার কিনছি, আর ফিনল্যান্ড এগুলো তৈরির জন্য বিখ্যাত। যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী নৌ ও উপকূলরক্ষী জাহাজ দেশেই নির্মিত হওয়ার কথা।

কিন্তু জাতীয় নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে ট্রাম্প এই শর্ত শিথিল করেন। তিনি রাশিয়া ও চীনের আক্রমণাত্মক সামরিক তৎপরতা ও অর্থনৈতিক অনুপ্রবেশের কথা উল্লেখ করেন। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আর্কটিক মহাসাগর ধীরে ধীরে নৌ চলাচলের জন্য সহজ হয়ে উঠছে। আইসব্রেকার পথ তৈরি করলে এশিয়া থেকে ইউরোপে নতুন বাণিজ্যপথ খুলে যাচ্ছে, রাশিয়ার ওপর দিয়ে কিংবা আলাস্কা ও কানাডার উত্তর পাশ ঘুরে গ্রিনল্যান্ড পেরিয়ে। বরফ কমে যাওয়ায় আর্কটিকের নিচে থাকা তেল-গ্যাস ক্ষেত্রেও প্রবেশ সহজ হচ্ছে।

হেলসিঙ্কিভিত্তিক আর্কটিক বিশেষজ্ঞ ও অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন নৌ কর্মকর্তা পিটার রিবস্কি বলেন, ওই অঞ্চলে এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি যান চলাচল হচ্ছে। রাশিয়ায় সক্রিয় তেল-গ্যাস শিল্প রয়েছে, পাশাপাশি ইউরোপ থেকে এশিয়ায় নতুন ট্রান্সশিপমেন্ট রুটও তৈরি হচ্ছে।

গত শরতে ট্রাম্পের ঘোষণার পর ২৯ ডিসেম্বর প্রথম চুক্তিগুলো দেওয়া হয়। ফিনল্যান্ডের রাউমা মেরিন কনস্ট্রাকশন কোম্পানি মার্কিন উপকূলরক্ষীর জন্য দুটি আইসব্রেকার তৈরি করবে রাউমা বন্দরের শিপইয়ার্ডে। প্রথম জাহাজটি ২০২৮ সালে হস্তান্তরের কথা। আরও চারটি নির্মিত হবে যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানায়। সব ক’টিই আকার আর্কটিকের ডিজেল-ইলেকট্রিক নকশায়। এই অর্ডারের লক্ষ্য রাশিয়ার বিশাল আইসব্রেকার বহরের সঙ্গে ব্যবধান কমানো। বর্তমানে রাশিয়ার প্রায় ৪০টি আইসব্রেকার রয়েছে, যার মধ্যে আটটি পারমাণবিক শক্তিচালিত। 

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে রয়েছে মাত্র তিনটি কার্যকর জাহাজ। চীনের আছে প্রায় পাঁচটি মেরু উপযোগী জাহাজ, যদিও রিবস্কির মতে, এগুলোর কোনোটিই প্রকৃত অর্থে আইসব্রেকারের কঠোর মানদণ্ড পূরণ করে না। সূত্র: বিবিসি

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here