চীনের সমাধিতে মিলল ২০০০ বছর আগের কম্পিউটার

0
চীনের সমাধিতে মিলল ২০০০ বছর আগের কম্পিউটার

কম্পিউটার বলতে সাধারণত ইলেকট্রনিক চিপ ও বিদ্যুৎনির্ভর যন্ত্রকেই বোঝানো হয়। তবে সেই ধারণাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে চীনের বিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক এক গবেষণা। পশ্চিম চীনের একটি প্রাচীন সমাধিতে প্রায় ২০০০ বছর আগের একটি যন্ত্রের সন্ধান পাওয়া গেছে, যা আধুনিক কম্পিউটারের আদি রূপ হতে পারে বলে দাবি করা হচ্ছে।

চীনা বিজ্ঞানীদের মতে, ‘তি হুয়া জি’ বা অলংকৃত তাঁত নামে পরিচিত এই যন্ত্রটি মূলত বাইনারি বা দ্বিমিক পদ্ধতিতে কাজ করত, যা আজকের ডিজিটাল প্রযুক্তির মূল ভিত্তি। চায়না অ্যাসোসিয়েশন ফর সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি কাস্ট এর গবেষকেরা জানিয়েছেন, যন্ত্রটি ইনপুট আউটপুট ও প্রোগ্রামিং নীতির ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হতো।

২০১২ সালে ছেংদু শহরে মেট্রো লাইন নির্মাণের সময় পশ্চিম হান রাজবংশের খ্রিষ্টপূর্ব ১৫০ অব্দের একটি সমাধি থেকে চারটি তাঁত যন্ত্রের মডেল উদ্ধার করা হয়। দীর্ঘ গবেষণার পর বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হন, এই যন্ত্রগুলো পুরোপুরি প্রোগ্রামেবল ছিল।

আধুনিক কম্পিউটারে যেমন সফটওয়্যার ব্যবহৃত হয়, তেমনি এই প্রাচীন তাঁত যন্ত্রে নকশা করা প্যাটার্ন কার্ড ব্যবহার করা হতো। এসব কার্ডের মাধ্যমে নির্ধারিত হতো কোন সুতা ওপরে উঠবে এবং কোনটি নিচে নামবে।

আধুনিক কম্পিউটারের ভাষা যেখানে শূন্য ও এক, সেখানে এই যন্ত্রে সুতা ওপরে উঠলে তাকে এক এবং নিচে নামলে শূন্য হিসেবে গণনা করা হতো। এভাবে প্রায় ৯৬ লাখ সুতার সংযোগস্থল নিয়ন্ত্রণ করে জটিল নকশা তৈরি করা সম্ভব হতো, যা বর্তমান বাইনারি ক্যালকুলেশনের প্রাচীন রূপ বলে মনে করছেন গবেষকেরা।

দীর্ঘদিন ধরে ধারণা ছিল বিজ্ঞান ও কম্পিউটিংয়ের সূচনা ইউরোপে। ১৯৪৬ সালে পেনসিলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্মিত এনিয়াককে প্রথম ইলেকট্রনিক কম্পিউটার হিসেবে ধরা হয়। তবে কাস্ট বলছে, চীনা কারিগররা দুই হাজার বছর আগেই অটোমেশন ও তথ্য সংরক্ষণের কৌশল আয়ত্ত করেছিলেন।

ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, এই প্রযুক্তি সিল্ক রোড ধরে পারস্য হয়ে ইউরোপে পৌঁছায়। দ্বাদশ শতাব্দীতে ইতালির ভেনিসে এই ধরনের তাঁত ব্যবহার শুরু হয়। ১৮০৫ সালে ফরাসি কারিগর জোসেফ ম্যারি জ্যাকোয়ার্ড এই ধারণা থেকেই পাঞ্চ কার্ড নিয়ন্ত্রিত স্বয়ংক্রিয় তাঁত উদ্ভাবন করেন। পরবর্তী সময়ে এই পদ্ধতিই উনিশ শতকের শুরুর দিকের কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ে ব্যবহৃত হয়।

কার্ল মার্ক্স তাঁর ক্যাপিটাল গ্রন্থে জ্যাকোয়ার্ড তাঁতকে বাষ্পীয় ইঞ্জিনের আগের বিশ্বের সবচেয়ে জটিল মেশিন হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।

আরও একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ১৯৪৬ সালে এনিয়াক তৈরির দলে অন্যতম প্রধান সদস্য ছিলেন চীনা বিজ্ঞানী ঝু চুয়ানজু। অনেক গবেষকের মতে, তিনি প্রাচীন চীনের তাঁত প্রযুক্তি এবং আই চিং দর্শনের বাইনারি তত্ত্ব থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েছিলেন।

চীনের বিজ্ঞান জাদুঘরের সাবেক পরিচালক ওয়াং ইউশেং বলেন, এই তাঁত যন্ত্র কেবল বস্ত্রশিল্পের সরঞ্জাম নয়, এটি প্রাচীন প্রোগ্রামিং চিন্তা ও যান্ত্রিক বুদ্ধিমত্তার এক অনন্য নিদর্শন, যা আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির মৌলিক নীতিগুলোর ভিত্তি গড়ে দিয়েছে।

সূত্র: সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here