গাজীপুর জেলার কালিগঞ্জ উপজেলার জামালপুর ইউনিয়নের কাপাইস গ্রামের বিনিরাইল এলাকায় প্রতিবছর চৈত্র সংক্রান্তির প্রথম দিনে প্রায় আড়াইশো বছর ধরে ঐতিহ্যবাহী এই জামাই মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। ঐতিহ্যবাহী এই মেলা আজও তার সক্রিয়তা আর জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছে। তবে লোকমুখে কেউ কেউ এই মেলাকে জামাই মেলা নামে ডাকে আবার অনেকে মাছের মেলা হিসেবেই পরিচিতি দিয়ে থাকে। তবে এটি কোন সাধারণ জামাই মেলা নয় গাজীপুরসহ আশপাশের মধ্যে সবথেকে বৃহৎ মেলা হিসেবেও পরিচিত। যা জামাইদের সম্মান আর আপ্যায়নকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা হয়।
কথিত আছে, পৌষ সংক্রান্তি উপলক্ষে ১৮’শতকে মেলাটির প্রচলন হয়। মূলত মাছ মেলা হিসেবে শুরু হলেও পরবর্তীতে এটি জামাই মেলা নামে পরিচিতি পায়। বিনিরাইল মেলা প্রাঙ্গণের আশপাশের স্থানীয় প্রবীণরা জানান, উপজেলার জাঙ্গালিয়া, বক্তারপুর ও জামালপুর ইউনিয়নের ত্রি মোহনায় বিনিরাইল গ্রামের পাশে কৃষকের ফসলের জমিতে বসে এই মাছের মেলা। প্রায় ২৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে কৃষকের ধান কাটার পর ওই জমিতে স্থানীয়রা এ মেলার আয়োজন করেন। মেলার প্রধান আকর্ষণ বিশাল আকৃতির মাছ। প্রতি বছর পৌষ মাসের শেষে মাঘ মাসের প্রথম দিনটিতে বিনিরাইল গ্রামে এ মাছের বা জামাই মেলা বসে। এই মেলা শুধু একটি গ্রাম নয়-এটি হয়ে ওঠে স্মৃতি, সম্পর্ক আর সংস্কৃতির এক প্রাণবন্ত ঠিকানা।
বুধবার ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই বিনিরাইল ও আশপাশের মাঠজুড়ে নামে মানুষের ঢল। দিনভর ও রাত পর্যন্ত চলা এ মেলায় লাখো মানুষের পদচারণায় মুখরিত গ্রামটি। দূরদূরান্ত থেকে আগত জামাই-শ্বশুরসহ সাধারণ দর্শনার্থীদের ভিড়ে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা শুধু গাজীপুর নয় ঢাকা, টাঙ্গাইল, কিশোরগঞ্জ, নরসিংদীসহ আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে বিশাল আয়োজনের এই মেলা দেখতে ছুটে আসে অনেক মানুষ। মেলার প্রধান আকর্ষণ হলো জামাইদের জন্য বিশাল বিশাল আকৃতির মাছ। মেলা প্রাঙ্গণে দুই শতাধিক মাছ ব্যবসায়ী সামুদ্রিক ও নদীর নানা প্রজাতির বড় মাছের পসরা সাজান। রুই, কাতলা, বোয়াল, চিতল, বাঘাইর, আইড়, কালী বাউশ, পাবদা, গলদা চিংড়ি, ইলিশ, সারষ, সামুদ্রিকসহ নানা প্রজাতির মাছ পাওয়া যায় এখানে। এসব মাছ আসে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে। বিক্রেতারা জানান, তুলনামূলকভাবে কম দামে বড় মাছ পাওয়া যায় বলে ক্রেতাদের আকর্ষণ বেশি। মাছের পাশাপাশি মেলায় থাকে ফার্ণীচার, তৈজসপত্র, মিষ্টি, খেলনা, ফলমূল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দোকান। নানা রকমের খাবারের দোকানও বসেছে এ মেলায়।
মেলায় সারি সারি বড় বড় সাজানো থাকে মূলত: জামাইদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য। তবে শুধু জামাই নন শশুরসহ অন্যান্য আত্মীয়রাও পুরো পরিবার নিয়ে এই মেলায় ছুটে আসেন আনন্দ উপভোগ এর জন্য। মাছের পাশাপাশি মেলায় বিক্রি হয় নানা ধরনের দেশিয় পণ্য, মুড়ি, মুড়কি, শিশুদের জন্য খেলনা, হরেক রকমের মিষ্টি ও গ্রামীণ পণ্য। মেলাকে কেন্দ্র করে দিনব্যাপী এক উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করে গ্রামটিতে।
এদিকে মেলা আয়োজন কমিটির সভাপতি আলী হোসেন জানান, ঐতিহ্য ধরে রাখতে প্রতি বছর মেলার আয়োজন করা হয়ে থাকে। তবে আগে মেলায় দোকান বসাতে টাকা দিতে হলেও এবার কোন টাকা আদায় করা হচ্ছে না।

