অর্থনৈতিক সংস্কারের সুযোগ হারিয়েছে বাংলাদেশ

0
অর্থনৈতিক সংস্কারের সুযোগ হারিয়েছে বাংলাদেশ

অন্তর্বর্তী সরকার উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতিতে সামষ্টিক স্থিতিশীলতা, রিজার্ভের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারলেও বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান বাড়ানো এবং কাঠামোগত সংস্কারের ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি বলে মনে করেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. এম মাসরুর রিয়াজ। তাঁর মতে, বাংলাদেশ একটি বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংস্কারের সুযোগ হারিয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির দুর্বলতা ও বেসরকারি খাতকে নীতি নির্ধারণে সম্পৃক্ত না করার ফলে প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তিগুলো থমকে গেছে। নতুন সরকারের এখন প্রধান কাজ হবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জনজীবনে স্বস্তি ফেরানো।

এক সাক্ষাত্কারে তিনি দেশের অর্থনীতি কোন অবস্থায় দাঁড়িয়ে, অন্তর্বর্তী সরকারের সাফল্য ও ব্যর্থতা এবং নতুন সরকারের সামনে কী কী চ্যালেঞ্জ—এসব নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন।  
 
প্রশ্ন : দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কিভাবে মূল্যায়ন করবেন?

এম মাসরুর রিয়াজ : অর্থনীতিতে আমরা এখন অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং সময় পার করছি। এই চ্যালেঞ্জের সূত্রপাত একেবারে সাম্ক্রতিক সময়ে, এমনটা বলা যাবে না। বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশ বেশ কিছুদিন ধরেই একটি গভীর সামষ্টিক অর্থনৈতিক (ম্যাক্রো ইকোনমিক) সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

বলা যায়, আমরা একসময় একটি ম্যাক্রো ইকোনমিক ক্রাইসিসের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলাম। এই সংকটের সূচনা মূলত ২০২২ সালের মাঝামাঝি থেকে। এর ফলে আমরা দেখেছি, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও প্রবৃদ্ধির ভিত্তি যেসব প্রধান সূচকের ওপর দাঁড়িয়ে, সেগুলো একের পর এক ক্রমাগতভাবে অবনতির দিকে গেছে, যা ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলমান ছিল।
 

প্রশ্ন: এই ম্যাক্রো অর্থনৈতিক অবনতির প্রধান লক্ষণগুলো কী ছিল?

এম মাসরুর রিয়াজ : প্রথমত, টাকার মান।

২০২২ সালের মাঝামাঝি থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত প্রায় দুই বছরে টাকার মান প্রায় ৪০ শতাংশ অবমূল্যায়িত হয়েছে। দ্বিতীয়ত, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। এই সময়ে ফরেন রিজার্ভ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়ে নেট রিজার্ভ ১৮ থেকে ১৯ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছিল। তৃতীয়ত, মূল্যস্ফীতি। এক পর্যায়ে প্রায় ১৪ শতাংশে পৌঁছে যায়, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করে।

চতুর্থত, আর্থিক ও ব্যাংকিং খাত। ব্যাংকিং সেক্টরে নন-পারফর্মিং লোন (এনপিএল), প্রভিশনিং শর্টফল, ক্যাপিটাল শর্টফলের মতো সমস্যা ক্রমাগত খারাপের দিকে যাচ্ছিল।
 

প্রশ্ন : এমন পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। তাদের সামনে প্রধান অগ্রাধিকারগুলো কী ছিল, কতটা তারা বাস্তবায়ন করতে পেরেছে?

এম মাসরুর রিয়াজ : এই পরিস্থিতির মধ্যেই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে। অর্থাৎ এই সরকার কোনো স্বাভাবিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পায়নি; বরং একটি ভারী সংকট ও উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া বোঝা নিয়ে ২০২৫ সাল শুরু হয়েছে। তবে ২০২৫ সালের শুরুতে অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে এবং সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য চারটি বড় অগ্রাধিকার স্কষ্ট ছিল—

১. ম্যাক্রো ইকোনমিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা: আমার দৃষ্টিতে, এই কাজের সূচনা ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর নাগাদ শুরু হয়েছিল। তখনই কিছু প্রাথমিক পর্যায়ে ইতিবাচক ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছিল। ২০২৫ সালের শুরুতে মূল লক্ষ্য ছিল, এই স্থিতিশীলতার প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেওয়া এবং একটি তুলনামূলক স্থিতিশীল অবস্থানে পৌঁছা।

২. অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তিগুলো পুনরুজ্জীবিত করা : এখানে মূলত বিনিয়োগ, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, রপ্তানি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা (এসএমই)— এই গ্রোথ ড্রাইভারগুলোর কথা বলা হচ্ছে। উদ্দেশ্য ছিল এগুলোকে চাঙ্গা করে কর্মসংস্থান আবার প্রবৃদ্ধির ধারায় ফেরানো। একই সঙ্গে সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনা বা ফিসক্যাল ম্যানেজমেন্টে যে গভীর সংকট তৈরি হয়েছিল, বিশেষ করে রাজস্ব আদায়ের দীর্ঘমেয়াদি দুর্বলতা, দ্রুত বেড়ে যাওয়া বৈদেশিক ঋণ এবং সরকারি প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম—এই বিষয়গুলোও ছিল দ্বিতীয় অগ্রাধিকারের অংশ।

৩. অর্থনৈতিক সুশাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা : বিশেষ করে ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে সুশাসন ফিরিয়ে আনা ছিল অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি সামগ্রিক অর্থনৈতিক নীতি কাঠামো, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে সুশাসন প্রতিষ্ঠার বিষয়টিও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমলাতন্ত্র, নির্দিষ্ট কিছু ব্যাবসায়িক গোষ্ঠীর অতিরিক্ত সুবিধা, সেক্টরভিত্তিক বৈষম্য—এসব সমস্যা তখন প্রকট হয়ে উঠেছিল।

৪. কাঠামোগত সংস্কার : বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বহু বছরের জমে থাকা কাঠামোগত সমস্যা রয়েছে। দেশীয় ও রপ্তানি—দুই ক্ষেত্রেই বৈচিত্র্যের অভাব, কর-জিডিপি অনুপাত কম হওয়া, পরোক্ষ করের ওপর অতিনির্ভরতা, বিশাল ইনফরমাল অর্থনীতি ও ইনফরমাল কর্মসংস্থান— এসব মিলিয়ে একটি ব্যাপক সংস্কার কর্মসূচির প্রয়োজন ছিল।

প্রশ্ন : বিদায়ি বছরের শেষ দিকে এসে এই অগ্রাধিকারগুলো কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে?

এম মাসরুর রিয়াজ : ২০২৫ সালের শেষের দিকে এসে যদি মূল্যায়ন করি, তাহলে দেখা যাবে, প্রথম অগ্রাধিকার ম্যাক্রো ইকোনমিক স্থিতিশীলতা : এখানে তুলনামূলকভাবে ভালো সাফল্য এসেছে। আমার মতে, এর পেছনে বাংলাদেশ ব্যাংকের নেতৃত্ব ও সময়োপযোগী বলিষ্ঠ সিদ্ধান্ত বড় ভূমিকা রেখেছে। এক্সচেঞ্জ রেট : ২০২৪ সালের মে মাসের পর থেকে এক্সচেঞ্জ রেট মোটামুটি স্থিতিশীল। ১৪ মে এক্সচেঞ্জ রেট পুরোপুরি ফ্লেক্সিবল করা হলেও টাকার বড় কোনো পতন হয়নি। বরং টাকার মান বৃদ্ধির চাপ তৈরি হয়েছিল।

মূল্যস্ফীতি : ইনফ্লেশন ১৩ থেকে ১৪ শতাংশের ভয়াবহ স্তর থেকে নেমে বর্তমানে ৮-৯ শতাংশের মধ্যে এসেছে। যদিও এটি এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নয়, তবে পরিস্থিতি স্কষ্টভাবে উন্নত হয়েছে। রিজার্ভ : নেট রিজার্ভ ১৮ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২৬ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি এসেছে। এটি এখনো দুর্বল, তবে আগের তুলনায় ভালো। বাংলাদেশ ব্যাংক সাম্ক্রতিক মাসগুলোতে প্রায় তিন বিলিয়ন ডলার কিনেছে, যাতে টাকার অতিরিক্ত শক্তিশালী হয়ে রপ্তানির প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। যদিও এর ফলে বাজারে অতিরিক্ত লিকুইডিটি ঢুকেছে, প্রয়োজনে মানি মার্কেট অপারেশনের মাধ্যমে সেটি শোষণ করা যেতে পারে। তবে দীর্ঘ মেয়াদে রিজার্ভ বাড়ানোর মূল পথ হলো রপ্তানি ও রেমিট্যান্স বৃদ্ধি।

প্রশ্ন : সুশাসনের ক্ষেত্রে কী ধরনের অগ্রগতি হয়েছে?

এম মাসরুর রিয়াজ : সুশাসনের ক্ষেত্রে আংশিক সাফল্য আছে। ব্যাংকিং খাতে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত মালিকানার মাধ্যমে যে লুটপাট চলছিল, সেটি অনেকাংশে বন্ধ করা গেছে। ব্যাংক বোর্ড পুনর্গঠন, তথ্য প্রকাশ ও এনপিএল সংক্রান্ত স্বচ্ছতা কিছুটা ফিরেছে। এনবিএফআই খাতেও কিছু অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু এর বাইরে সরকারি বিনিয়োগ (এডিপি) ব্যবস্থাপনা, আমলাতান্ত্রিক বিলম্ব, রেগুলেটরি এনফোর্সমেন্ট, বাজার মনিটরিং ও প্রাইস ম্যানিপুলেশন রোধ—এই বড় বড় সুশাসনের ক্ষেত্রগুলোতে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি। ফলে ইনফ্লেশন ও ব্যাবসায়িক পরিবেশে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

 
প্রশ্ন : প্রবৃদ্ধি ও কাঠামোগত সংস্কারের অবস্থা কী?

এম মাসরুর রিয়াজ : প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি ও কাঠামোগত সংস্কারের ক্ষেত্রে কার্যত সাফল্য নেই বললেই চলে। বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির প্রায় ২২ শতাংশে নেমে এসেছে। এফডিআই কমিটমেন্ট আগের বছরের তুলনায় প্রায় অর্ধেকে নেমেছে।

কর্মসংস্থান : বেসরকারি গবেষণা অনুযায়ী বেকারত্ব ও দারিদ্র্য বেড়েছে। আন্ডারএমপ্লয়মেন্ট ও ‘নিট’ (শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা প্রশিক্ষণের সঙ্গে যুক্ত নয়) জনসংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। রপ্তানি খাত : প্রায় ২০০ গার্মেন্টস কারখানা বন্ধ হয়েছে। ইউরোপীয় বাজারে চাহিদা কমেছে। টেক্সটাইল ও ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ সেক্টর মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। এসএমই ও কনস্ট্রাকশন সেক্টর : উচ্চ সুদের হার, জ্বালানি সংকট ও কম এডিপির কারণে চরম চাপের মধ্যে রয়েছে।

আইন-শৃঙ্খলা, সংস্কার ও ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ: রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, নির্বাচন নিয়ে ধোঁয়াশা এবং প্রশাসনিক টালমাটাল অবস্থাও বিনিয়োগে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাম্ক্রতিক সময়ে বিভিন্ন পন্থী ও উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর কার্যক্রম, বিভিন্ন জায়গায় হামলা ও সহিংসতার ঘটনা আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে বড় ধরনের দুর্বলতা সৃষ্টি করেছে। এই ঘটনাগুলো বিনিয়োগ পরিবেশে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এই আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ব্যবসায়ীদের মধ্যে গভীর আতঙ্ক তৈরি করেছে। বিনিয়োগ পরিবেশে এটি এখন একটি বড় বিষফোড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যবসা ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আস্থা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, আর এই আস্থার জায়গাটাই এখানে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

 
প্রশ্ন : সংস্কারের ক্ষেত্রে কি আমরা সুযোগ হারিয়েছি?

এম মাসরুর রিয়াজ : সংস্কারের সাফল্য অত্যন্ত সীমিত। এখানে আমি মূলত অর্থনৈতিক সংস্কারের কথাই বলছি। যদিও সাংবিধানিক, বিচার বিভাগীয় বা নিরাপত্তা খাতের সংস্কার নিয়ে আলোচনা হয়েছে, অর্থনৈতিক সংস্কারের জটিলতা তুলনামূলকভাবে কম ছিল এবং এগুলোতে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ অনেক বেশি ছিল। ১৫ থেকে ১৬ মাসে অর্থনৈতিক সংস্কারের ক্ষেত্রে অনেক দূর এগোনো সম্ভব ছিল। কিছু সংস্কার হয়েছে, বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতে। ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশ এসেছে, খেলাপি ঋণের সংজ্ঞা পরিমার্জন হয়েছে, ফরেন এক্সচেঞ্জ ব্যবস্থাপনায় কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। দুর্বল ব্যাংকগুলো কিভাবে হ্যান্ডল করা হবে, ডিপোজিটরদের সুরক্ষা কিভাবে নিশ্চিত করা হবে, সে বিষয়ে একটি কাঠামো তৈরি হয়েছে। কিন্তু এর বাইরে বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সংক্রান্ত কাঠামোগত সংস্কার, যেমন—ট্যাক্স রিফর্ম, কাস্টমস রিফর্ম, ল্যান্ড রিফর্ম, এনভায়রনমেন্টাল ও সোশ্যাল কমপ্লায়েন্স, এনফোর্সমেন্ট অব কন্ট্রাক্ট, ইনসলভেন্সি ও এক্সিম ফেমওয়ার্ক, ক্যাপিটাল মার্কেট ও ইনস্যুরেন্স সেক্টরের সংস্কার—এই গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে কার্যকর অগ্রগতি দেখা যায়নি। এনবিআরে রেভিনিউ পলিসি ও রেভিনিউ ম্যানেজমেন্ট আলাদা করা হয়েছে, কিন্তু সেটিও মূলত আইএমএফের শর্ত পূরণের অংশ। আমরা আশা করেছিলাম, অন্তত এক বা দুই বছর মেয়াদি অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও প্রবৃদ্ধি পুনঃস্থাপনের একটি সুস্কষ্ট পথনকশা আসবে, যা আসেনি।

আমি নিশ্চিতভাবে বলব, সংস্কারের দিক থেকে আমরা একটি বড় সুযোগ হারিয়েছি। ইন্টেরিম সরকার স্বল্পমেয়াদি হলেও তারা ছিল নন-পলিটিক্যাল। ফলে তাদের ওপর রাজনৈতিক চাপ তুলনামূলকভাবে কম ছিল, সংস্কার শুরু করার জন্য তাদের হাত অনেকটাই খোলা ছিল। সব সংস্কার ১৫ থেকে ১৬ মাসে শেষ করা সম্ভব নয়, এটা বাস্তবতা। কিন্তু একটি সুসংগঠিত সংস্কার কর্মসূচি শুরু করা যেত। এই সুযোগটি বাংলাদেশ হারিয়েছে; শুধু সরকার নয়, দেশ হিসেবে আমরা হারিয়েছি।

 
প্রশ্ন : সরকারের প্রধান উপদেষ্টা, অর্থ উপদেষ্টা, পরিকল্পনা উপদেষ্টা, গভর্নর থেকে শুরু করে শীর্ষ পর্যায়ে অনেক যোগ্য, অভিজ্ঞ ও স্বনামধন্য মানুষ থাকার পরও কেন অর্থনৈতিক সংস্কারে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি?

এম মাসরুর রিয়াজ : যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও বাস্তবায়নের ঘাটতি লক্ষ করা গেছে। এই সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে একাধিক স্বনামধন্য অর্থনীতিবিদ ছিলেন—প্রধান উপদেষ্টা, অর্থ উপদেষ্টা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর। যোগ্যতা বা সদিচ্ছার অভাব ছিল, এ কথা আমি বলব না। কিন্তু সংস্কার বাস্তবায়ন একটি সম্কূর্ণ ভিন্ন বিষয়। সংস্কারের জন্য দরকার সংস্কার নকশা ও রোডম্যাপ, আমলাতন্ত্রকে কার্যকরভাবে সম্কৃক্ত করা, স্টেকহোল্ডারদের একত্র করা, রাজনৈতিক অর্থনীতির বাধাগুলো চিহ্নিত করা। এই পুরো ম্যানেজমেন্ট দিকটাতেই ঘাটতি ছিল। মাঠ পর্যায়ে, হাতে-কলমে সংস্কার এগিয়ে নেওয়ার অভাব আমরা দেখেছি।

 

প্রশ্ন : সরকারের কার্যক্রম ও নীতি প্রণয়নে অংশীজনদের সম্কৃক্ততা কতটা দেখছেন?

এম মাসরুর রিয়াজ : আরেকটি বড় দুর্বলতা ছিল অংশীজনদের এনগেজমেন্ট। ব্যবসায়ী সংগঠন, শিল্প খাত, রপ্তানিকারক, এমনকি রাজনৈতিক দলগুলোকেও অনেক ক্ষেত্রে যথাযথভাবে সম্কৃক্ত করা হয়নি। লালদিয়া বন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কিংবা ইউএস ট্যারিফ নেগোসিয়েশনের ক্ষেত্রেও শুরুতে পর্যাপ্ত পরামর্শ দেখা যায়নি। নীতি প্রণয়নে থিংকট্যাংক ও গবেষণা সংস্থাগুলোর সঙ্গে কিছু যোগাযোগ হলেও যারা বাস্তবে অর্থনীতি চালায়—বেসরকারি খাত, তাদের সম্কৃক্ততা ছিল অপর্যাপ্ত।

 

প্রশ্ন : নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?

এম মাসরুর রিয়াজ : আগামী সরকারের জন্য কৌশলগতভাবে চারটি বিষয় এখনো সমানভাবে প্রাসঙ্গিক—১. ম্যাক্রো অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা : ইনফ্লেশন এখনো ৮ শতাংশের ওপরে। রিজার্ভ ২৬ বিলিয়নে উন্নীত হলেও ভবিষ্যতে প্রবৃদ্ধি বাড়লে আমদানি চাপ বাড়বে। তাই রিজার্ভ ৩০ থেকে ৩৫ বিলিয়নের দিকে নিতে হবে। এক্সচেঞ্জ রেট স্থিতিশীলতা ধরে রাখাও বড় চ্যালেঞ্জ। ২. প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তির পুনরুজ্জীবন : বিনিয়োগ, রপ্তানি ও ক্ষুদ্র ব্যবসা—এই তিনটি ছাড়া কর্মসংস্থান সম্ভব নয়। স্মল বিজনেস এতটাই দুর্বল যে শুধু প্রবৃদ্ধির অপেক্ষায় থাকলে হবে না। তাদের জন্য বিশেষ সহায়তা প্যাকেজ দরকার—ফিন্যান্সিং, ট্রেনিং, মার্কেট অ্যাকসেস ও সরকারি ক্রয়ে অগ্রাধিকার। ৩. সুশাসন জোরদার করা : ব্যাংকিং খাতে চুরি বন্ধ হয়েছে, কিন্তু এনপিএল এখনো ৩৬ শতাংশ। কিছু ব্যাংক বন্ধ করা, কিছু পুনর্গঠন করা, অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কম্কানি গঠন—এসব কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। পাশাপাশি রেড টেপ কমানো ও নীতি নির্ধারণের প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা বাড়াতে হবে।

৪. সংস্কার কর্মসূচি : আমি আশা করব, নতুন সরকার প্রথম ৯০ দিনের মধ্যে এক, দুই ও পাঁচ বছর মেয়াদি একটি স্কষ্ট অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচি দেবে; বিশেষ করে বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সংস্কার, ট্যাক্স ও কাস্টমস রিফর্ম, পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজমেন্ট, শ্রমবাজার ও স্কিল ডেভেলপমেন্ট, রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান কৌশল।

 
প্রশ্ন : আপনি সাতটি থিমেটিক পিলারের কথা বলেছেন, সেগুলো কী?

এম মাসরুর রিয়াজ : আমি মনে করি, নতুন সরকারের অর্থনৈতিক কৌশল সাতটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়ানো উচিত— ১. ম্যাক্রো ইকোনমিক স্টেবিলিটি, ২. প্রুডেন্ট ফিসক্যাল ও পাবলিক ফিন্যান্স ম্যানেজমেন্ট, ৩. রপ্তানি প্রতিযোগিতা ও বৈচিত্র্য, ৪. বেসরকারি ও বৈদেশিক বিনিয়োগ, ৫. ব্যাংকিং ও আর্থিক খাত সংস্কার, ৬. শ্রমবাজার, স্কিল ও রেমিট্যান্স কৌশল এবং ৭. প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন ও নীতিনির্ধারণ সক্ষমতা।

 

প্রশ্ন : প্রাইভেট সেক্টর এনগেজমেন্টের ক্ষেত্রে কী ধরনের ঘাটতি দেখেছেন?

এম মাসরুর রিয়াজ : ৫ আগস্টের আগের সময়ে আমরা দেখেছি, এই এনগেজমেন্ট অনেকটাই দলীয় বা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকেন্দ্রিক ছিল। গত কয়েক মাসে কিছুটা উন্নতি হয়েছে, বিশেষ করে কিছু ফরেন ইনভেস্টরকে ছোট গ্রুপে এনগেজ করা হয়েছে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে এখনো প্রাইভেট সেক্টরের বড় অংশ এই প্রক্রিয়ার বাইরে রয়ে গেছে। বাস্তবতা হলো, এই অভিযোগ বা ক্ষোভ প্রাইভেট সেক্টর থেকেই প্রকাশিত হয়েছে। সুতরাং আমরা যদি পলিসি ও রেগুলেশনের ক্ষেত্রে সেক্টরভিত্তিক সিদ্ধান্তে কিংবা সার্বিকভাবে বিনিয়োগ, রপ্তানি ও স্মল বিজনেসের ক্ষেত্রে নিয়মিত ও প্রাতিষ্ঠানিক পাবলিক-প্রাইভেট ডায়ালগ এবং ইন্টার্যাকশন গড়ে তুলতে না পারি, তাহলে বিনিয়োগ ও রপ্তানি এগিয়ে নেওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে।

 

প্রশ্ন : দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমে যাওয়ায় আগামী দিনে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ বড় চ্যালেঞ্জ। উত্তরণের উপায় কী?

এম মাসরুর রিয়াজ : জ্বালানি সরবরাহের বিষয়টি এমন, যা দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ, ডমেস্টিক ইকোনমি ও এক্সপোর্ট ইকোনমি—সবকিছু সরাসরি প্রভাবিত করে। ১. জ্বালানি খাত : জ্বালানি খাতে আমরা এখন একটি সংকটকালীন অবস্থার মধ্যে আছি, বিশেষ করে গ্যাসের ক্ষেত্রে। আমাদের চাহিদার তুলনায় গ্যাসের সরবরাহ মারাত্মকভাবে কম। আমদানি করেও এই ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ করা সম্ভব নয়, কারণ এলএনজি আমদানি অত্যন্ত ব্যয়বহুল। অন্যদিকে ১৪ থেকে ১৫ বছর ধরে ডমেস্টিক গ্যাস অসুন্ধান অনেকটাই থমকে থাকার কারণে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারে আমরা অনেক পিছিয়ে পড়েছি। আমরা আশা করেছিলাম, গত ১৫ মাসে অন্তত কয়েকটি ব্লকে কূপ খননের কাজ শুরু হবে। কিন্তু তা হয়নি। অথচ এটি করতেই হবে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রেও একই চিত্র। সৌরবিদ্যুৎসহ বিভিন্ন নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার কথা ছিল। আমরা আশা করেছিলাম, এই সময়ের মধ্যে কয়েকটি প্রকল্পের কন্ট্রাক্ট সম্কন্ন হবে, সেটিও হয়নি। সব মিলিয়ে আমাদের আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরের জন্য একটি বাস্তবসম্মত পাওয়ার ও এনার্জি মাস্টারপ্ল্যান, সেই প্ল্যানের বাস্তবায়ন কৌশল এবং অর্থায়নের রোডম্যাপ—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে প্রয়োজন।

 
প্রশ্ন : আপনার মতে ব্যাংকিং খাতে প্রধান সমস্যাগুলো কী এবং সমাধানের পথ কী?

এম মাসরুর রিয়াজ : ব্যাংকিং খাতে সমস্যাগুলো নতুন নয়। একদিকে নন-পারফর্মিং লোন (এনপিএল) এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোকে একটি স্থিতিশীল সমাধানের দিকে নিয়ে যেতে হবে; অন্যদিকে অর্থায়নের নতুন উৎস ও নতুন বাজার তৈরি করা জরুরি। এখানে শুধু ব্যাংকিং নয়—নতুন ফিন্যানশিয়াল প্রোডাক্ট, ডিজিটাল ফিন্যান্স এবং ব্যাংকের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ক্যাপিটাল মার্কেট ডেভেলপমেন্ট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ক্যাপিটাল মার্কেট বলতে আমি শুধু স্টক মার্কেট বোঝাচ্ছি না, বরং বন্ড মার্কেটসহ দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের পুরো ইকোসিস্টেম। এমনকি আন্তর্জাতিক ক্যাপিটাল মার্কেটকে আমরা কিভাবে দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করতে পারি, সেই দিকেও আমাদের যেতে হবে।

 
প্রশ্ন : সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা কী হওয়া উচিত?

এম মাসরুর রিয়াজ : নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ আজ চরম চাপের মধ্যে আছে। আমরা দেখছি—মানুষ সঞ্চয়বিমুখ হয়ে পড়েছে, কারণ সঞ্চয়ের সক্ষমতা নেই; সুদের হার বাড়লেও সঞ্চয়ে উৎসাহ তৈরি হচ্ছে না, বেকারত্ব ও আন্ডার-এমপ্লয়মেন্ট বাড়ছে এবং দারিদ্র্য বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে নতুন সরকারের কাছে মানুষের সবচেয়ে বড় চাওয়া দুটি—১. কর্মসংস্থান এবং ২. মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ।

কর্মসংস্থান ছাড়া আয়ের কোনো ভিত্তি নেই। আর আয় থাকলেও যদি ইনফ্লেশন বেশি থাকে, মানুষ সঞ্চয় করতে পারবে না; ভোগ কমাবে, যা আবার অর্থনীতিকে আঘাত করে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো খাদ্য গ্রহণ পর্যন্ত কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে। তাই স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য তাত্ক্ষণিক সহায়তা, ইনফ্লেশন কমা পর্যন্ত সরকারকে দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের পাশে থাকতে হবে—স্বল্পমূল্যে খাদ্য কর্মসূচির আওতা বাড়ানো, প্রয়োজনে মধ্যবিত্তের একটি অংশকে অন্তর্ভুক্ত করা, শ্রমজীবী মানুষের যাতায়াত ব্যয় কমাতে ট্রান্সপোর্ট ভাতা, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম সমন্বয় অনিবার্য হলে লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকি বা ক্যাশ সাপোর্ট দেওয়া। কারণ খাদ্য ও পরিবহন—এ দুই খরচই শ্রমজীবী মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় চাপ।

 

প্রশ্ন : নতুন সরকারের জন্য আপনার শেষ বার্তা কী?

এম মাসরুর রিয়াজ : গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী নতুন বাংলাদেশের বাস্তবতায় নতুন সরকারের জন্য আমার দৃষ্টিতে পাঁচটি মৌলিক অগ্রাধিকার—১. গণতন্ত্রের সুসংহতকরণ। ২. নাগরিককেন্দ্রিক নীতি ও সেবা পুনঃপ্রতিষ্ঠা—শুধু অর্থনীতি নয়, শিক্ষা ও সামাজিক সেবায়ও। ৩. প্রাতিষ্ঠানিক ও অর্থনৈতিক সুশাসন প্রতিষ্ঠা। ৪. আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি প্রথম দিন থেকেই শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণ ও ধরে রাখা। ৫. দেশীয় স্টেকহোল্ডার ও কৌশলগত বৈশ্বিক অংশীদারদের সঙ্গে দক্ষ ও ভারসাম্যপূর্ণ সম্কর্ক গড়ে তোলা।

বিশ্ব এখন একটি জটিল জিওপলিটিক্যাল সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই বাস্তবতা বুঝে, সচেতনভাবে ও দূরদৃষ্টিসম্কন্নভাবে বৈশ্বিক সম্কর্ক ও অর্থনৈতিক কৌশল পরিচালনা করাই হবে নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

সৌজন্যে : কালের কণ্ঠ
 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here