অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা কয়েক বছর ধরেই। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর আশা ছিল তা কেটে যাবে। অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে। বেসরকারি খাতে আস্থার সংকট কেটে গিয়ে বিনিয়োগ চাঙা হবে।
বেকারত্ব কমবে। কিন্তু পরিস্থিতির কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হয়নি। বরং ক্ষেত্রবিশেষে আরো খারাপ হয়েছে। তবে আশার কথা হলো, মাত্র এক মাস পরই অনুষ্ঠিত হবে জাতীয় নির্বাচন।
আসবে নতুন সরকার। ফলে আশা জাগছে মানুষের মধ্যে। বিশেষ করে বেসরকারি খাতে আশা—জাগানিয়া উৎসাহ-উদ্যম। ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তারা মনে করছেন, তাদের খারাপ সময়ের অপেক্ষা শেষ হবে নতুন রাজনৈতিক সরকার এলে।
যারাই ক্ষমতায় আসুক, তারা দেশকে স্থিতিশীল করবে, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আসবে। গতি ফিরবে অর্থনীতিতে।
তথ্য-উপাত্ত বলছে, দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা ও স্থবিরতা কাটিয়ে দেশের অর্থনীতির কয়েকটি সূচক স্থিতিশীল হচ্ছে। বিশেষ করে রেমিট্যান্সপ্রবাহ ভালো। এর ওপর ভর করে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও স্বস্তি।
যদিও শিল্পের কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানিতে ভাটা পড়ায় রিজার্ভে স্বস্তি বিরাজ করছে। তার পরও ডলারের দরে যে বিশৃঙ্খলা ছিল তাতে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। কিন্তু পুরো সহনীয় হয়নি। মূল্যস্ফীতি আগের কয়েক মাস কিছুটা কমে এলেও সর্বশেষ হিসাবে তা আবারও বেড়েছে বলে জানিয়েছে পরিসংখ্যান ব্যুরো। সব মিলিয়ে অর্থনীতি কঠিন সময় পার করছে। সবাই অপেক্ষা করছে আসছে নির্বাচনের।
ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ‘অপেক্ষা করো ও দেখো’ নীতিতে আটকে থাকা অনেক বিনিয়োগকারী এখন ধীরে ধীরে সিদ্ধান্ত বদলানোর দিকে হাঁটছেন। রাজনৈতিক সরকার এলে নীতিগত স্থিরতা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সুযোগ তৈরি হবে—এমন ধারণা থেকেই তাঁদের মনোভাবে পরিবর্তন আসছে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে, তবে এগুলোর গতি ছিল ধীর। ব্যাংক খাত সংস্কার অন্যতম বড় পদক্ষেপ ছিল। এর ফলে
রেমিট্যান্স ও রপ্তানি বেড়েছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ভালো অবস্থায় গেছে এবং বড় ধরনের অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঠেকানো গেছে। এটি একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য। যদিও সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা রক্ষা করা গেছে, কিন্তু মূল্যস্ফীতি এখনো উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। বিনিয়োগ আসছে না, কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হচ্ছে না, রাজস্ব আহরণ বাড়ছে না। তাই পরবর্তী নতুন সরকারকে বিষয়গুলো গুরুত্বসহকারে নিয়ে কাজ করতে হবে।’
তিনি বলেন, বিনিয়োগকারীরা স্বল্প সময়ের জন্য বিনিয়োগ করেন না। ব্যবসায় রিটার্ন আসতে পাঁচ থেকে সাত বছর লেগে যায়। তাই তাঁরা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা দেখতে চান। নির্বাচিত সরকার এলে বিনিয়োগে স্থবিরতা কাটতে পারে।
খারাপের মধ্যেও রেমিট্যান্স ও রিজার্ভে স্বস্তি : অর্থনীতির সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে উঠেছে প্রবাস আয়ের প্রবাহ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে প্রথমবারের মতো এক বছরে ব্যাংকিং চ্যানেলে আসা রেমিট্যান্সের পরিমাণ ৩২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। সদ্যবিদায়ী বছরে প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন ৩২.৮২ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ২২ শতাংশ বেশি। ২০২৪ সালে যেখানে রেমিট্যান্স ছিল ২৬.৮৯ বিলিয়ন ডলার, সেখানে এক বছরে বেড়েছে প্রায় ৫.৯ বিলিয়ন ডলার।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, গণ-অভ্যুত্থানের পর সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ফেরাতে এই রেমিট্যান্সই ছিল সবচেয়ে বড় ভরসা। ডলারের বাজারে চাপ কমাতে এবং আমদানি ব্যয় মেটাতে এই বৈদেশিক মুদ্রা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
উচ্চ রেমিট্যান্স প্রবাহের কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে ডলার কিনছে, এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও শক্তিশালী হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে রিজার্ভ বেড়ে প্রায় ৩৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল। এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) বিল পরিশোধের পর তা নেমে বর্তমানে মোট রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩২.৪৪ বিলিয়ন ডলার। আইএমএফের বিপিএম৬ পদ্ধতিতে হিসাব করা নিট রিজার্ভ এখন ২৭.৮৫ বিলিয়ন ডলার।
ডলারের বাজারে অস্থিরতা কমেছে, কার্ব মার্কেট ও ব্যাংক রেটের ব্যবধান সংকুচিত হয়েছে। আমদানিকারকদের জন্য এটি বড় স্বস্তির খবর, কারণ এলসি খোলার খরচ কমছে এবং কাঁচামাল ও ভোগ্যপণ্য আমদানি কিছুটা সহজ হয়েছে। যদিও ব্যবসায়ী-বিশ্লেষকরা দাবি করেন, বিনিয়োগ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় না হওয়া, শিল্পের চাহিদা কমে যাওয়ায় আমদানি কম হওয়ায় ডলারের খরচ কমেছে, যা রিজার্ভ বাড়াতে সহায়তা করছে। এটা আপাত দৃষ্টিতে ভালো মনে হলেও এটি বিনিয়োগ না হওয়ার লক্ষণ, যা অর্থনীতির জন্য দীর্ঘ মেয়াদে ভালো খবর নয়।
ব্যাংক ও পুঁজিবাজারে গতি : দীর্ঘদিনের তারল্য সংকট ও আস্থার ঘাটতি কাটিয়ে পুঁজিবাজারেও সূচক কিছুটা বাড়তে শুরু করেছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) সূচক ও লেনদেন বাড়ছে। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সক্রিয়তা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বাজারে একটি স্থিতিশীলতার বার্তা দিচ্ছে। বিনিয়োগকারীরা আশা করছেন, নির্বাচনের পর নতুন সরকার বাজার সংস্কার ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে আরো শক্তিশালী করবে।
অর্থনীতিতে গতি কিছুটা বেড়েছে : পিএমআই সূচক : আসছে নির্বাচন ঘিরে সবার মধ্যে আশার সঞ্চার করায় ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রকাশিত সর্বশেষ পারচেজিং ম্যানেজার্স ইনডেক্স (পিএমআই) সূচকের মান সামান্য উন্নীত হয়ে ৫৪.২-এ দাঁড়িয়েছে, যা আগের মাসের ৫৪ থেকে কিছুটা বেশি। এটি নির্দেশ করছে, দেশের অর্থনীতির সামগ্রিক সম্প্রসারণের ধারা অব্যাহত আছে, যদিও এর গতি খুব দ্রুত নয়। চারটি প্রধান খাতের মধ্যে কৃষি (৫৯.৬), উৎপাদন (৫৮.২) এবং সেবা (৫১.৮) খাত প্রবৃদ্ধির ধারায় থাকলেও নির্মাণ খাত (৪৯.৮) সংকোচনের দিকে ফিরে গেছে। বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, অর্থনীতির বর্তমান প্রবৃদ্ধি মূলত কৃষি খাতের শক্তিশালী অবস্থানের ওপর নির্ভরশীল, অন্যদিকে শিল্প ও নির্মাণ খাতে চাপ পরিলক্ষিত হচ্ছে। তবে ভবিষ্যৎ ব্যবসা সূচকে সব প্রধান খাতেই ইতিবাচক মনোভাব বিদ্যমান, যা নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক গতি বজায় থাকার আশাবাদ তৈরি করেছে।
নির্বাচিত সরকারে বিনিয়োগের আশা : ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, রাজনৈতিক সরকার এলে বিনিয়োগে আস্থা ফিরবে তিনটি কারণে। প্রথমত, নির্বাচিত সরকার পাঁচ থেকে ১০ বছরের দীর্ঘমেয়াদি নীতি পরিকল্পনা নিতে পারে, যা ঝুঁকি কমায়। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা থাকায় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমে এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি আসে। তৃতীয়ত, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, জাতীয় নির্বাচনই এ বছরের সবচেয়ে বড় আশার জায়গা। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এলে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও ভোগ বাড়বে, যা অর্থনীতিকে নতুন গতি দেবে।
সামনে বড় চ্যালেঞ্জ : এই ইতিবাচক সূচকের আড়ালে চ্যালেঞ্জও কম নয়। রপ্তানি খাতে স্থবিরতা কাটেনি। টানা পাঁচ মাস ধরে রপ্তানি আয় কমছে। সদ্যঃসমাপ্ত ডিসেম্বর মাসে রপ্তানি কমেছে ১৪.২৩ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে রপ্তানি আয় আগের বছরের তুলনায় ২.১৯ শতাংশ কম।
মূল্যস্ফীতিও বড় উদ্বেগ। ডিসেম্বর মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮.৪৯ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭.৭১ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯.১৩ শতাংশ। বাজার ব্যবস্থাপনা ও জ্বালানি ব্যয়ের চাপের কারণে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
বিনিয়োগেও এখনো আস্থার ঘাটতি স্পষ্ট। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবরে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৬.২৩ শতাংশে। একই সঙ্গে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির এলসি নিষ্পত্তি কমেছে ১৬.৭৭ শতাংশ, যা শিল্পায়নের গতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, আইন-শৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগের পথে বড় বাধা। বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমের মতে, আইন-শৃঙ্খলা ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ছাড়া দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আসবে না।
আস্থাই মূল চাবিকাঠি : অর্থনীতিবিদদের মতে, নতুন সরকারের জন্য প্রথম কাজ হবে বিনিয়োগকারীদের মনে আস্থা ফেরানো। আইন-শৃঙ্খলা, নীতিগত স্থিরতা ও কার্যকর সংস্কার ছাড়া এই ইতিবাচক সূচকগুলো টেকসই হবে না। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে যদি সরকার দ্রুত স্থিতিশীলতা ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে অর্থনীতির এই আশার আলো বাস্তব গতি পেতে পারে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ গতকাল বলেন, ‘আমরা মনে করি, গণতন্ত্রে উত্তরণের বছরে নতুন সরকারের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে আইন-শৃঙ্খলার উন্নয়ন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব ঘাটতি কমানো, বিনিয়োগে আস্থা ফেরানো, ভঙ্গুর ব্যাংকিং খাতের সংস্কার এবং জ্বালানি সংকটের নিরসন। পাশাপাশি বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধ ও ডলার সংকটের চাপে সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখা হবে অন্যতম চ্যালেঞ্জ। এ ছাড়া ২০২৬ সালে এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী শুল্কমুক্ত সুবিধা হারানো মোকাবেলায় রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে নির্বাচিত সরকারকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে।’
সৌজন্যে : কালের কণ্ঠ

