ইরানে দেশজুড়ে ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানিয়েছে অনলাইন পর্যবেক্ষণ সংস্থা নেটব্লকস। চলমান তীব্র অর্থনৈতিক সংকটকে কেন্দ্র করে দেশটির বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার মধ্যেই এই ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট দেখা গেছে। খবর আল জাজিরার।
গতকাল বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে নেটব্লকস জানায়, ইন্টারনেট বন্ধের আগে দেশজুড়ে বিক্ষোভ দমনে ধারাবাহিকভাবে ডিজিটাল সেন্সরশিপ ও নজরদারি জোরদার করা হচ্ছিল। সংস্থাটির ভাষায়, এমন পদক্ষেপ একটি সংকটময় সময়ে জনগণের যোগাযোগের অধিকারকে গুরুতরভাবে ব্যাহত করছে।
গত বছরের ডিসেম্বরের শেষ দিক থেকে ইরানের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ শুরু হয়। লাগামহীন মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং স্থানীয় মুদ্রার বড় ধরনের অবমূল্যায়নের প্রতিবাদে মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। বার্তা সংস্থা এএফপির হিসাব অনুযায়ী, স্থানীয় গণমাধ্যম ও সরকারি সূত্রের বরাতে জানানো হয়েছে—বিক্ষোভ শুরুর পর থেকে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসহ অন্তত ২১ জন নিহত হয়েছেন।
শুক্রবার ভোরে তেহরান থেকে আল জাজিরার সাংবাদিক তোহিদ আসাদি জানান, বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় রাত ৮টার পর রাজধানীজুড়ে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। তিনি বলেন, তেহরানের বিভিন্ন পাড়া-মহল্লা থেকে বিক্ষোভকারীরা জড়ো হয় এবং শহরের বেশ কয়েকটি সড়ক অবরোধ করা হয়। এ সময় বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষও ঘটে।
তোহিদ আসাদি বলেন, বিক্ষোভ চলাকালে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানবিরোধী স্লোগান শোনা গেছে। তাঁর ভাষায়, অর্থনৈতিক চাপ সাধারণ মানুষের আস্থা ভেঙে দিয়েছে এবং ক্ষোভকে আরও উসকে দিয়েছে। বিশেষ করে শ্রমজীবী ও নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষেরা দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে চরম সংকটে পড়েছে।
বিক্ষোভ নিয়ে ইরানি কর্তৃপক্ষের বক্তব্যও একরকম নয়। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বিক্ষোভ মোকাবিলায় সর্বোচ্চ সংযম দেখানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তবে এর আগে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি দাঙ্গাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বলেন। একই সঙ্গে দেশটির প্রধান বিচারপতি বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগ তোলেন।
প্রধান বিচারপতি গোলাম হোসেইন মোহসেনি এজেই বলেন, যারা অস্থিরতা সৃষ্টি করবে, তাদের প্রতি কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। তাঁর ভাষায়, যারা দাঙ্গা বা অরাজকতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে রাস্তায় নামছে বা তাদের সমর্থন করছে, তারা ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের শত্রুদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাজ করছে।
এদিকে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বিক্ষোভ-সংক্রান্ত সহিংসতায় প্রাণহানি বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন। জাতিসংঘের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক জানান, গুতেরেস কর্তৃপক্ষকে মতপ্রকাশ, সংগঠন এবং শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার রক্ষার আহ্বান জানিয়েছেন।
এর আগে ২০২২ ও ২০২৩ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ইরানে ব্যাপক বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ২২ বছর বয়সী ওই তরুণীকে নারীদের পোশাকবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে আটক করার পর পুলিশি হেফাজতে তাঁর মৃত্যু হয়। চলমান বিক্ষোভের মধ্যেই মানবাধিকার সংগঠনগুলো অভিযোগ করেছে, আহত বিক্ষোভকারীদের আটক করতে নিরাপত্তা বাহিনী হাসপাতালেও অভিযান চালাচ্ছে।
মঙ্গলবার অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানায়, পশ্চিম ইরানের ইলাম শহরের ইমাম খোমেনি হাসপাতালে নিরাপত্তা বাহিনী অভিযান চালায়। সংস্থাটির অভিযোগ অনুযায়ী, সেখানে টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ, দরজা ভাঙচুর এবং চিকিৎসাকর্মীসহ উপস্থিত ব্যক্তিদের ওপর হামলা চালানো হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, নিরাপত্তা বাহিনীকে অবিলম্বে বেআইনি শক্তি ও আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার বন্ধ করতে হবে এবং আহত ব্যক্তিদের যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে।
সূত্র: আল জাজিরা, এএফপি, নেটব্লকস, সিএনএন, এফ টি

