কুড়িগ্রামের ৯ উপজেলায় এ বছর সরিষার ব্যাপক আবাদ হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবার বাম্পার ফলনের প্রত্যাশা করছেন কৃষকরা। সরেজমিন দেখা যায়, মাঠের পর মাঠজুড়ে শুধু সরিষার খেত। সরিষা ফুলের হলুদ হাসি জুগিয়েছে কৃষকদের মুখেও। জেলা সদর, রাজারহাট, উলিপুর, চিলমারী, রৌমারী, রাজীবপুর, ফুলবাড়ী, ভুরুঙ্গামারী ও নাগেশ্বরী উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সরিষা চাষ হয়েছে। বিশেষ করে জেলার ১৬টি নদনদীর চরে কৃষকরা বেশি সরিষা চাষ করেছেন।
জানা যায়, ধরলা ও দুধকুমার নদে জেগে ওঠা চরে হলদে ফুলে ছেয়ে গেছে মাঠের পর মাঠ। ফসলের মাঠের দিকে তাকালে দিগন্তজুড়ে হলুদ গালিচা বিছানো রয়েছে। মৌমাছির মধু সংগ্রহের গুঞ্জনে মুখরিত ফসলের এ মাঠ। গত বছরের তুলনায় এবার দেড় হাজার হেক্টর জমিতে বেশি সরিষা চাষ হয়েছে বলে কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে। কম খরচে অধিক লাভ তাই সরিষা চাষের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। সরিষা চাষে কৃষকরা লাভের পাশাপাশি দেশে তেলের চাহিদা পূরণ হবে। সয়াবিন তেলের চেয়ে অধিক পুষ্টিগুণ সম্পন্ন এ তেল। জেলাজুড়ে এ তেলের চাহিদাও অনেক।
কুড়িগ্রাম জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে জেলার ৯ উপজেলার ৭৩টি ইউনিয়নের নদনদীর চরসহ বিভিন্ন জমিতে ২৫ হাজার ৭৫০ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষ করা হয়েছে। কৃষকরা বারী ১৪, ১৭, ১৮ ও বীনা ৮, ৯, ১১ জাতের সরিষা চাষ করেছেন। গত বছর সরিষা চাষ করা হয়েছিল ২৫ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে। সরিষা চাষে সময় লাগে কম, খরচও কম, লাভ বেশি। এ বছর সরিষা উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে বলে প্রত্যাশা করছে স্থানীয় কৃষি বিভাগ। উপজেলা কৃষি বিভাগের উদ্যোগে কৃষি প্রণোদনার আওতায় সরিষা চাষে কৃষকদের আগ্রহী করে তুলতে উন্নত জাতের সরিষার বীজ ও সার প্রদান করা হয়।
কৃষকরা জানান, আমন কাটা মাড়াইয়ের পর ৩-৪ মাস পর্যন্ত জমি পতিত থাকে। এই সময় পতিত জমিতে বাড়তি লাভের আশায় সরিষা চাষ করেছেন তারা। সরিষা কর্তন শেষে ওই জমিতে আবার বোরো আবাদ করা যায়। এতে অল্প সময়ে একই জমিতে দুটি ফসলের চাষে লাভবান হওয়া যায়। জমিতে সরিষা রোপণ করা থেকে পরিপক্ব হতে সময় লাগে প্রায় দেড় থেকে দুই মাস। প্রতি বিঘা জমিতে সরিষা চাষে সবমিলিয়ে খরচ হয় দেড় থেকে ২ হাজার টাকা। এক বিঘা জমিতে সরিষা উৎপাদন হয় ৫-৬ মণ। সরিষার দামও ভালো পাওয়া যায়। তাই সরিষা বিক্রির টাকা দিয়ে ইরি বোরো চাষে খরচ করা যায়। পাশাপাশি পরিবারের ভোজ্য তেলের চাহিদাও মেটানোও সম্ভব হয়।
উপজেলার চরভূরঙ্গামারী ইউনিয়নের কৃষক ইউসুফ ও শফিয়ার বলেন, ‘আমরা দুই বিঘা করে জমিতে সরিষা চাষ করেছি। প্রতি বিঘা জমিতে ২ হাজার টাকা করে ব্যয় হয়েছে। এবার ফলন ভালো হলে লাভবান হতে পারব।’
উলিপুর উপজেলার দলদলিয়া ইউনিয়নের শিয়ালখোড়া গ্রামের কৃষক মোস্তফা জামান বলেন, ‘আমি আড়াই বিঘা জমিতে সরিষা চাষ করেছি। আশা করছি ভালো ফলন হবে। এই সরিষা বিক্রি করে বোরো আবাদের তেল ও সার কেনার টাকা জোগাড় হয়ে যাবে।’
সদর উপজেলার যাত্রাপুর চরের কৃষক মজিবর মিয়া বলেন, ‘গতবারের চেয়ে চরে বেশি সরিষা চাষ করেছি। এবার থোকায় থোকায় ফুল ধরেছে এবং খেতগুলো দেখে খুবই ভালো লাগছে।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘আমরা ভোজ্য তেল হিসেবে সরিষার উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য কাজ করে যাচ্ছি। দেশের চাহিদা অনুযায়ী তেল উৎপাদন কম। এ জন্য কৃষকদের সব ধরনের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।’

