যেভাবে ট্রাম্পের ‘প্রিয় ফিল্ড মার্শাল’ হলেন আসিম মুনির

0
যেভাবে ট্রাম্পের ‘প্রিয় ফিল্ড মার্শাল’ হলেন আসিম মুনির

মার-আ-লাগোতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২২ ডিসেম্বর ইউক্রেন যুদ্ধ থামানোর ঘোষণা দেন। ঠিক তখনই দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে নাটকীয় বাঁক বদলের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ট্রাম্প দাবি করেন, তিনি পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে একটি সম্ভাব্য পারমাণবিক যুদ্ধ ঠেকিয়ে দিয়েছেন। তার জন্য তিনি কৃতজ্ঞতা জানান পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের প্রতি। চলতি বছরে এটি ছিল ট্রাম্পের পক্ষ থেকে জেনারেল মুনিরের দশম প্রকাশ্য প্রশংসা। অক্টোবরে শার্ম আল শেখ শান্তি সম্মেলনে তো ট্রাম্প তাকে সরাসরি তার ‘প্রিয় ফিল্ড মার্শাল’ হিসেবে অভিহিত করেন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০২৫ সালটি পাকিস্তানের জন্য একটি বড় পরিবর্তনের বছর ছিল। সেনাপ্রধান আসিম মুনির কেবল সামরিক কমান্ডার হিসেবে নন বরং একজন ‘সেনা-কূটনীতিক’ হিসেবে পাকিস্তানের হারানো আন্তর্জাতিক মর্যাদা পুনরুদ্ধারে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছেন। বিশেষ করে মে মাসে ভারতের সাথে চার দিনের আকাশ যুদ্ধের পর পাকিস্তানের অবস্থান রাতারাতি বদলে যায়। 

যদিও দুই দেশই সেই যুদ্ধে নিজেদের জয়ী দাবি করেছে। কিন্তু পাকিস্তান এই পরিস্থিতিকে ওয়াশিংটনের সাথে তাদের সম্পর্ক মেরামতের কাজে দক্ষতার সাথে ব্যবহার করেছে। সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী খুররম দস্তগির খান মনে করেন, ভারতের সাথে ওই সংঘাতই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জেনারেল মুনিরের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে। ট্রাম্পের মতো ব্যক্তিত্বের সাথে ব্যক্তিগত সখ্যতা তৈরির পথও প্রশস্ত করেছে।

২০২৫ সালের শুরু থেকেই মার্কিন প্রশাসনের সুর বদলাতে শুরু করে। গত মার্চ মাসে কংগ্রেসের যৌথ অধিবেশনে ট্রাম্প অ্যাবে গেট হামলার অন্যতম মূল হোতাকে গ্রেপ্তারে সহায়তার জন্য পাকিস্তান সরকারকে ধন্যবাদ জানান। এরপর থেকেই নিরাপত্তা সহযোগিতার বাইরে গিয়ে ক্রিপ্টো মাইনিং এবং খনিজ সম্পদের মতো অর্থনৈতিক খাতেও দুই দেশের আলোচনা বিস্তৃত হয়। 

তবে এই কূটনৈতিক সাফল্যের সমান্তরালে পাকিস্তানে অভ্যন্তরীণ ক্ষমতা কাঠামোতেও বিশাল রদবদল ঘটেছে। মে মাসের যুদ্ধের পর আসিম মুনিরকে ফিল্ড মার্শাল পদে উন্নীত করা হয়। সংবিধানের ২৭তম সংশোধনীর মাধ্যমে তাকে চিফ অব ডিফেন্স ফোর্সেস হিসেবে নিয়োগ দিয়ে তিন বাহিনীর সর্বময় কর্তৃত্ব প্রদান করা হয়।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পাকিস্তানের এই ‘ভৌগোলিক পুনরুত্থান’ বেশ দৃশ্যমান। বাংলাদেশ থেকে শুরু করে মধ্য এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সাথে পাকিস্তানের সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করেছে। বিশেষ করে সৌদি আরবের সাথে প্রতিরক্ষা চুক্তি এবং গাজায় শান্তি রক্ষায় মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাহিনীতে যোগ দেওয়ার আগ্রহ পাকিস্তানের কৌশলগত গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ফাহদ হুমায়ুন মনে করেন, মুনির খুব দ্রুত মধ্যপ্রাচ্যের সংকট এবং ভারতের সাথে সংঘাতকে ব্যবহার করে ট্রাম্প প্রশাসনের উচ্চ পর্যায়ে নিজের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করেছেন।

তবে এই বাহ্যিক সাফল্যের আড়ালে দেশের ভেতরে চ্যালেঞ্জগুলো দিন দিন আরও ঘনীভূত হচ্ছে। মানবাধিকার কর্মী এবং সমালোচকরা সতর্ক করে বলছেন, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমর্থন আদায়ের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ দমন-পীড়ন এবং রাজনৈতিক সংকটকে আড়াল করার চেষ্টা চলছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের কারাবাস, গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ এবং বেলুচিস্তানে বাড়তে থাকা অস্থিরতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক মারিয়া রশিদ। তিনি মনে করেন, মে মাসের যুদ্ধ মুনিরের জনপ্রিয়তাকে বাড়াতে সাহায্য করলেও দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো এবং আইনি ব্যবস্থার ওপর সামরিক নিয়ন্ত্রণ আরও পাকাপোক্ত করেছে। ফলে ভূ-রাজনৈতিক অর্জন পাকিস্তানের জন্য কতটা টেকসই হবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।

সূত্র: আল জাজিরা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here