ইশতেহার অনুযায়ী নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে কর্মসংস্থানভিত্তিক প্রকল্প নিতে শুরু করেছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন তারেক রহমানের সরকার। দেশের বিপুলসংখ্যক বেকার যুবককে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করে আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে উপজেলা পর্যায়ে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম জোরদার করে গ্রামেই কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে। নতুন উদ্যোক্তা গড়ে তুলতে প্রায় ২৭৫ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়। ‘কর্মসংস্থান ও আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে উপজেলা পর্যায়ে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম জোরদারকরণ প্রকল্প (২য় পর্যায়)’ শীর্ষক এ কর্মসূচির আওতায় তিন বছরে তিন লাখ ৬৬ হাজারের বেশি যুবক-যুব মহিলাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এর মধ্যে অন্তত এক লাখ ৮৩ হাজার ২৭০ জনকে আত্মকর্মসংস্থানে যুক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অধীন যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। পরিকল্পনা কমিশনের আর্থ-সামাজিক অবকাঠামো বিভাগের অধীনে এটি প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২৭৪ কোটি ৯৯ লাখ টাকা, যা পুরোপুরি সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়িত হবে। প্রকল্পটি অনুমোদন পেলে তিন বছরে বাস্তবায়ন করবে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর।
প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হচ্ছে—স্থানীয় চাহিদার ভিত্তিতে দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ দিয়ে বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের উপযোগী করে গড়ে তোলা। এর মাধ্যমে দেশে বেকারত্ব ও দারিদ্র্য হ্রাস, নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরো গতিশীল করা। পাশাপাশি যুবকদের নিজ নিজ এলাকায় কৃষিভিত্তিক খামার গড়ে তুলে শহরমুখী প্রবণতা কমিয়ে গ্রামেই আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা।
প্রকল্পটি দেশের ৬৪টি জেলার সব উপজেলায় বাস্তবায়ন করা হবে। এতে ১০টি মেট্রোপলিটন ইউনিট থানাও অন্তর্ভুক্ত হবে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এর আগে প্রথম পর্যায়ে দেশের ৫৭টি জেলার ৪৪২টি উপজেলায় এই কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয়েছিল। এ ছাড়া উত্তরাঞ্চলের সাতটি জেলার ৪৭টি উপজেলায় আরেকটি প্রকল্পের মাধ্যমে একই ধরনের কার্যক্রম পরিচালিত হয়। আগের প্রকল্পগুলোর মেয়াদ শেষ হওয়ায় এবার সারা দেশের সব উপজেলা অন্তর্ভুক্ত করে দ্বিতীয় পর্যায়ের এই প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় স্বল্পমেয়াদি বিভিন্ন ট্রেডে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। স্থানীয় চাহিদা অনুযায়ী ১৪ ও ২১ দিন মেয়াদি প্রশিক্ষণ কোর্স চালু থাকবে। প্রতিটি সমতল উপজেলায় বছরে গড়ে ২৫০ জন এবং হাওর, উপকূলীয় ও পাহাড়ি উপজেলায় প্রায় ১৬০ জন বেকার যুবক ও যুবমহিলাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। প্রতি ব্যাচে সমতল অঞ্চলে ২৫ জন এবং হাওর ও পার্বত্য এলাকায় ২০ জন প্রশিক্ষণার্থী অংশ নিতে পারবেন।
প্রশিক্ষণের বিষয়বস্তু রাখা হয়েছে বহুমুখী ও বাস্তবমুখী। ১৪ দিনের প্রশিক্ষণে কুকিং, স্ট্রিট ফুড তৈরি, গরু মোটাতাজাকরণ, হাঁস-মুরগি পালন, গ্লাস পেইন্টিং, কৃত্রিম ফুল তৈরি, ভার্মি কম্পোস্ট, নার্সারি, আচার তৈরি এবং পরিবারভিত্তিক কৃষি কার্যক্রমের মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকবে। অন্যদিকে ২১ দিনের প্রশিক্ষণে কৃষি যন্ত্রপাতি মেরামত, অটোরিকশা ও মোটরসাইকেল মেরামত, বিউটিফিকেশন, পোশাক তৈরি, নকশিকাঁথা, ব্লক-বাটিক প্রিন্টিং, হস্তশিল্প পণ্য তৈরি, মোবাইল ফোন মেরামত, দুগ্ধজাত পণ্য উৎপাদন এবং ফ্রিল্যান্সিংসহ আধুনিক বিভিন্ন দক্ষতা উন্নয়ন কোর্স অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
প্রশিক্ষণ কোর্সে অংশগ্রহণের জন্য আবেদনকারীর ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা পঞ্চম শ্রেণি পাস এবং বয়স ১৮ থেকে ৩৫ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে বিশেষ ক্ষেত্রে ৪৫ বছর পর্যন্ত বয়স বিবেচনা করা হবে। বিধবা, স্বামী পরিত্যক্তা নারী, দলিত জনগোষ্ঠী, চা-শ্রমিক, হিজড়া সম্প্রদায়, প্রতিবন্ধী এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নারীদের প্রশিক্ষণে অগ্রাধিকার দেওয়ার নীতিও রাখা হয়েছে।
প্রশিক্ষণার্থীদের উৎসাহিত করতে প্রকল্পে বিভিন্ন প্রণোদনার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। প্রশিক্ষণকালীন প্রতিদিন ১৫০ টাকা হারে প্রশিক্ষণ ভাতা এবং ৫০ টাকা আপ্যায়ন ভাতা দেওয়া হবে। প্রশিক্ষণের সময় বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ মডিউল সরবরাহ করা হবে এবং অডিও-ভিডিওভিত্তিক প্রশিক্ষণসামগ্রী ব্যবহারের মাধ্যমে কোর্সগুলোকে আরো আকর্ষণীয় করে তোলা হবে।
প্রশিক্ষণ শেষে উদ্যোক্তা তৈরিতে সহায়তার জন্য যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের বিদ্যমান ঋণ কার্যক্রমের আওতায় সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা থাকবে। পাশাপাশি প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের উৎপাদিত পণ্য বাজারজাতকরণে সহায়তা দিতে আগ্রহী বেসরকারি কম্পানির সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের উদ্যোগ নেওয়া হবে, যাতে ‘ব্যাক-বাই’ পদ্ধতিতে পণ্য ক্রয়ের মাধ্যমে উদ্যোক্তারা ন্যায্য মূল্য পান।
প্রকল্প বাস্তবায়নে উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন। প্রশিক্ষণ আয়োজন, প্রশিক্ষণার্থী নির্বাচন, কোর্স পরিচালনা এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের তথ্য সংরক্ষণসহ পুরো কার্যক্রম তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত হবে। জেলা পর্যায়ে উপপরিচালক ও সহকারী পরিচালকরা এই কার্যক্রম তদারকি করবেন। এ ছাড়া মন্ত্রণালয় পর্যায়ে একটি স্টিয়ারিং কমিটি এবং অধিদপ্তর পর্যায়ে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করে নিয়মিত সভার মাধ্যমে প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হবে।
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জনগোষ্ঠী যুবসমাজ। এই বিপুল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করা গেলে তা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। প্রস্তাবিত প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে গ্রামীণ এলাকায় নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি, কৃষি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং দারিদ্র্য হ্রাসে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এ ধরনের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ড. মুস্তফা কে মুজেরি বলেন, ‘যুবকদের জন্য নেওয়া এই প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থান উদ্যোগ তখনই সফল হবে, যখন প্রশিক্ষণের মান নিশ্চিত করা এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের বাস্তবে আত্মকর্মসংস্থান তৈরি করা সম্ভব হবে। কেবল প্রশিক্ষণ দিলেই হবে না, প্রশিক্ষণের পর কতজন যুবক উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছেন তা নিয়মিত তদারকি করতে হবে। পাশাপাশি আধুনিক ও চাহিদাভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ দিতে হবে, যাতে তাঁরা দক্ষ কর্মী হিসেবে কাজ করতে পারেন। কার্যকর তদারকি, বাজারসংযোগ এবং সহজ ঋণ সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে এই কর্মসূচি বেকারত্ব কমানো, নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সৌজন্যে : কালের কণ্ঠ

