যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার চলমান উত্তেজনা এখন চরম বিস্ফোরণোন্মুখ পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক সামরিক পদক্ষেপ ইঙ্গিত দিচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে লক্ষ্য করে একটি বড় ধরনের এবং দীর্ঘমেয়াদী অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে ওয়াশিংটন। ইতোপূর্বে ট্রাম্পের শাসনামলে আইএসআইএস বা সিরিয়ার ওপর যেসব হামলা চালানো হয়েছিল, সেগুলো ছিল অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং লক্ষ্যভিত্তিক। তবে এবারের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন, কারণ মার্কিন সামরিক বাহিনী এখন ইরানের অভ্যন্তরে একাধিক পর্যায়ে শক্তিশালী ঢেউয়ের মতো সিরিজ আক্রমণের পরিকল্পনা সাজাচ্ছে, যার কোনো স্পষ্ট শেষ সীমানা আপাতত দেখা যাচ্ছে না।
বর্তমান এই সংকটময় পরিস্থিতির মূলে রয়েছে মূলত তিনটি প্রধান বিষয়ের সংমিশ্রণ। যেগুলো একসময় বিচ্ছিন্ন থাকলেও এখন একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে। ইরানের বিশাল ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার, দেশটির অভ্যন্তরে চলা গণবিক্ষোভের ওপর ভয়াবহ দমন-পীড়ন এবং তাদের অমীমাংসিত পারমাণবিক কর্মসূচি আজ যুক্তরাষ্ট্রকে একটি বড় সংঘাতের দিকে ঠেলে দিয়েছে। বিশেষ করে গত বছরের অক্টোবরে যখন ইরান থেকে ইসরায়েলের দিকে ঝাঁকে ঝাঁকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে মারা হয়েছিল, তখন থেকেই মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য বদলে যেতে শুরু করে। মার্কিন নৌবাহিনীর রণতরীগুলো সেই আক্রমণ প্রতিহত করলেও তা তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধের ক্ষেত্র তৈরি করে দেয়।
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এখন আর কেবল একটি আঞ্চলিক হুমকি নয় বরং এটি একটি বৈশ্বিক উদ্বেগের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার হাতে ইরানি ড্রোনের ব্যবহার এবং বেসামরিক অবকাঠামোতে সেসবের আঘাত আন্তর্জাতিক মহলে তেহরানের বিরুদ্ধে নেতিবাচক জনমত তৈরি করেছে। ফলস্বরূপ, মার্কিন সামরিক পরিকল্পনাবিদদের কাছে এখন প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্র, লঞ্চার এবং মজুদ ধ্বংস করা। যে কোনো সম্ভাব্য অভিযানের প্রথম ধাপেই ইরান যাতে পাল্টা আঘাত করার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলে, সেই কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে পেন্টাগন।
তবে এই সংকটের রাজনৈতিক স্ফুলিঙ্গটি মূলত প্রজ্জ্বলিত হয়েছে ইরানের ভেতরকার অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা থেকে। নতুন বছরের ঠিক আগমুহূর্তে ইরানে যে দেশব্যাপী প্রতিবাদ শুরু হয়েছিল, তা অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে দমন করে দেশটির শাসকগোষ্ঠী। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের সরাসরি সমর্থন জানিয়ে সতর্ক করেছিলেন, দমন-পীড়ন চললে যুক্তরাষ্ট্র হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না। কিন্তু ট্রাম্পের সেই হুঁশিয়ারি সত্ত্বেও হাজার হাজার সাধারণ মানুষকে প্রাণ হারাতে হয়েছে। বিশ্ববিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে এবং এমনকি ইউরোপীয় ইউনিয়নকেও ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করতে বাধ্য করেছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরানের এই অভ্যন্তরীণ দমন-পীড়নই ট্রাম্পকে কঠোর সামরিক পদক্ষেপ নিতে প্ররোচিত করেছে। ট্রাম্পের আগে দেওয়া হুমকির মর্যাদা রক্ষা করতে এখন আইআরজিসি এবং বাসিজ মিলিশিয়াদের কমান্ড সেন্টারগুলো মার্কিন লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় যুক্ত হয়েছে। এর ফলে অভিযানের পরিধি আগের তুলনায় বহুগুণ বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। যদি এই লড়াইয়ে কোনো মার্কিন সেনা হতাহত হয়, তবে যুদ্ধ কেবল সামরিক স্থাপনায় সীমাবদ্ধ থাকবে না বরং ইরানের অর্থনৈতিক অবকাঠামো এবং জ্বালানি খাতের ওপরও বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।
পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়টি এই উত্তেজনায় নতুন একটি মাত্রা যোগ করেছে। গত গ্রীষ্মে মার্কিন হামলায় ইরানের ফোরডো ও নাতাঞ্জ কেন্দ্রগুলোর ওপর আঘাত হানা হলেও তেহরান তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ করেনি। বরং নাতাঞ্জ এলাকায় পাহাড়ের নিচে ‘পিকাক্স’ নামক এক নতুন ও সুরক্ষিত স্থাপনা তৈরির খবর পাওয়া গেছে যা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। ইরানের অনড় অবস্থান এবং কূটনৈতিক আলোচনার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার কারণে ট্রাম্পের পরবর্তী সামরিক অভিযানে এই পারমাণবিক কেন্দ্রগুলো যে অন্যতম প্রধান টার্গেট হবে, তা প্রায় নিশ্চিত।
একসময় যেসব সংকট আলাদাভাবে সমাধান করা সম্ভব ছিল, এখন সেগুলো ট্রাম্পের একক কৌশলের অধীনে একটি বড় ঝুড়িতে এসে জমা হয়েছে। ফলে অভিযান শুরু হলে তা মাত্র এক রাতের হামলায় শেষ হবে না, বরং এটি কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহব্যাপী একটি পূর্ণাঙ্গ আকাশযুদ্ধে রূপ নিতে পারে। মার্কিন রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড ফোর্ড এবং বিপুল সংখ্যক সৈন্যের অবস্থান প্রমাণ করে যে, ওয়াশিংটন এখন উত্তেজনার সিঁড়িতে অনেক ধাপ ওপরে ওঠার জন্য প্রস্তুত রয়েছে। ইরানের পক্ষ থেকে পাল্টা জবাব কেমন আসে, তার ওপরই নির্ভর করছে এই যুদ্ধের চূড়ান্ত রূপরেখা।
বর্তমানে পৃথিবী এক অনিশ্চিত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে যুদ্ধ এড়ানোর কোনো কূটনৈতিক পথ আর দৃশ্যমান নয়। ওয়াশিংটন ও তেহরান কোনো পক্ষই এখন পিছু হটতে রাজি নয় বলে মনে হচ্ছে। শেষ মুহূর্তে কোনো অলৌকিক সমঝোতা না হলে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ আবারও গর্জে উঠবে মার্কিন যুদ্ধবিমানের শব্দে। ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মধ্যকার এই ছায়াযুদ্ধ এখন সরাসরি সম্মুখ সমরে রূপ নেওয়ার অপেক্ষায়, যা ট্রাম্পের কমান্ডার-ইন-চিফ হিসেবে দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় সবচেয়ে বড় এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরীক্ষা হতে যাচ্ছে।
সূত্র: সিএনএন

