গোপালগঞ্জ নিম্ন জলাভূমি বেষ্টিত জেলা। এ জেলার অধিকাংশ জমি বছরের ৮ মাস পানির নীচে থাকে। তখন জমিতে ফসল আবাদ হয় না। এ কারণে এ জেলায় ১ ফসলী জমি বেশি। শীতের (শুস্ক) মৌসুমে এসব জমিতে বোরো ধান চাষাবাদ হয়। জেলায় বোরো আবাদ শুরুর পরই শীত জেঁকে বসেছে। শীতে কৃষক মাঠে নামতে পারছে না। বোরো চাষাবাদ ব্যাহত হচ্ছে। এতে ধানের উৎপাদন কমে যাওয়ার আশংকা করছে কৃষক।
এ ছাড়া ঘন কুয়াশায় জেলার কোথাও কোথাও বোরা বীজতলা কোল্ড ইনজুরিতে পড়ার আশংকা দেখা দিয়েছে। কৃষি বিভাগ বোরো বীজতলা রক্ষার পরামর্শ দিচ্ছে। পাশাপাশি ধান রোপনের বয়স্কদের মাঠে নামতে নিষেধ করছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের গোপালগঞ্জ খামারবাড়ির উপ-পরিচালক ড.মো.মামুনুর রহমান জানিয়েছেন, এ বছর জেলার ৫ উপজেলায় ৮২ হাজার ৫৮৮ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সে লক্ষ্য ৪ হাজার ২৬০ হেক্টর জমিতে বোরো বীজতলার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়। কিন্তু কৃষক ৪ হাজার ৪৩০ হেক্টর বীজতলা করেছে। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে এ জেলায় ১৭০ হেক্টর জমিতে বেশি বীজতলা করা হয়েছে। বীজতলা এখন পর্যন্ত কোল্ড ইনজুরিতে হয়নি। কিছু বীজতলা কোল্ড ইনজুরিতে আক্রান্ত হলেও চাষাবাদ ব্যাহত হবে না।
এ পর্যন্ত জেলার ১২ হাজার ৩শ’৪৬ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। গত বছর এ সময়ের মধ্যে অন্তত ২৫ হাজার হেক্টর জমিতে ধান আবাদ হয়েছিল । সে তুলনায় এ বছর মাত্র অর্ধেক ধান আবাদ হয়েছে । মাত্রাতিরিক্ত শীতের কারণে বোরা চাষ ব্যাহত হচ্ছে। কৃষক মাঠে নামতে পারছেনা। এ কারণে আবাদ কম হয়েছে। আমরা কোল্ড ইনজুরি থেকে বীজতলা রক্ষায় কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছি। তাদেরকে সালফার কনটেন্ট বালাই নাশক স্প্রে করতে বলছি। রাতে বীজতলায় পানি রেখে, সকালে ছেড়ে দিতে ও পলিথিন দিয়ে দবীজতলা ঢেকে দিতে বলছি।
ওই কর্মকর্তা আরো বলেন, গত ২৫ ডিসেম্বর থেকে গোপালগঞ্জে শীতের দাপট বেড়েছে। এখনো এটি অব্যাহত রয়েছে । তাই বয়স্ক কৃষকদের আমরা মাঠে না নামার পরামর্শ দিচ্ছি। আগামী ৭/৮ দিন এমন আবহাওয়া থাকলে কৃষির মারাত্মক ক্ষতি হবে।তবে ৩০ জানুয়ারীর মধ্যে ধান রোপন শেষ করা গেলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশংকা নেই।
গোপালগঞ্জ আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবু সুফিয়ান বলেন, এ জেলার উপর দিয়ে মাঝারি শৈত্য প্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। ৭ জানুয়ারী সর্বনিম্ন তামমাত্রা ছিল ৭ ডিগ্রি। এর আগে ৩১ ডিসেম্বর তাপমাত্রা ৭.৫ ডিগ্রিতে নামে। গত ২৫ ডিসেম্বর থেকে এ জেলায় উত্তরের হিমেল হাওয়ার পাশাপাশি ঘণ কুয়াশায় শীতের তীব্রতা শুরু হয়। এটি অব্যাহত রয়েছে। সূর্যের দেখা মিলছে কম। এ কারণে শীত বেশি অনুভূত হচ্ছে। ৭ জানুয়ারী থেকে সূর্যের মুখ দেখা গেছে । এরমধ্যে আবার ২ দিন কুয়াশা বেড়ে শীতের দাপট আরো কিছুটা বেড়ে যেতে পারে । তবে ১২ জানুয়ারীর পর আবহাওয়া অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে আসবে বলে ওই কর্মকর্তা জানান।
গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার গোপীনাথপুর উত্তরপাড়া গ্রামের কৃষক রইচ খোন্দকার (৬৫)বলেন, আমাগে এ্যালেকায় নীচে জমি বেশি। বছরে এ্যট্টা মাত্র ধান হয়। এ ধান দিয়ে সার বছর চলতি হয়। এহন চারা বানায় বইসে রইছি, শীতির চোটে ভূইতে (জমি) লাগাতি পরিতিছিনে। শীতে বীজতলায় চারা বাড়ছে না। আমাগে গ্রামের ধানের চারা হলুল বা সাদা হয়ে গ্যাছে।
টুঙ্গিপাড়া উপজেলার গোপালপুর গ্রামের কৃষক নিরঞ্জন বিশ্বাস (৫৫) বলেন, আমাগে ৫২ শাতাংশের বিঘের ৩ বিঘে জমি পাথারে । জানুয়ারির ৮ তারিখির মধ্যি আনা বছর দেড় বিঘে জমির আবাদ হইয়ে যায়। এ বৎসর জম্বের শীত পড়িছে, তাই ক্ষ্যাতে নামতি পারতিছিনে। নামলি শরীরে কাঁপুনি দেয়। ক্ষ্যাতে বেশি সুমায় থাকতি পারিনে। এহন পর্যন্ত ৩০ শতাংশ জমি রোপন করতি পারছি।
কাশিয়ানী উপজেলার নিজামকান্দি গ্রামের ফরমান আলী (৫০) বলেন, ভূই ক্ষ্যাত চাষ দিছি । চারা বানাইছি। ধান লাগানুর জুন্নু বসে রইছি। শীতির কারণে ধান রুথি পারতিছিনে। চারার বয়েস বেশি দিন হয়ে যাতিছে। বেশি বয়েসি চারা রুলি ধানের ফলন কুমে যায়।
কোটালীপাড়া উপজেলার রাধাগঞ্জ গ্রামের কৃষক বিজন মন্ডল (৫২) বলেন, ধান লাগাইতে এ্যরতেছিনে। তাই চারা লয়ে দুশ্চিন্তা পইড়গেছি। কৃষি বিভাগের পরামর্শ লইয়ে স্পে, পানি ধরে রাহা ও ছাইরগে দেওয়া সহ চারা রক্ষা হরতে লাগছি । কি হবে বোঝতে এ্যারছিনে ।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক সঞ্জয় কুমার কুন্ডু বলেন, এ বছর বোরোধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ২ হাজার ৬শ’ ৩১ মেট্রিক টন। ৭ জানুয়ারি থেকে রোদ উঠছে। কৃষকও উৎসবরে আমেজে মাঠে নামতে শুরু করেছে। সমস্ত প্রতিকূলতা কাটিয়ে কৃষক শেষ পর্যন্ত আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে অধিক খাদ্য উৎপাদন করবে। খাদ্য উদ্বৃত্ত এ জেলায় অধিক ফসল ঘরে তুলে কৃষক লাভবান হবেন। এটিই আমাদের প্রত্যাশা ।

