রমজানে ক্যান্সার রোগী : কখন রোজা রাখা যাবে আর কখন নয়?

0
রমজানে ক্যান্সার রোগী : কখন রোজা রাখা যাবে আর কখন নয়?

মুসলিম উম্মাহর নিকট অত্যন্ত পবিত্র ও মহিমান্বিত মাস মাহে রমজান আমাদের মাঝে সমাগত। এই মাস আত্মশুদ্ধি, সংযম এবং ইবাদতের এক অনন্য সুযোগ, যা মুমিনের আত্মাকে প্রশান্ত করে এবং স্রষ্টার নৈকট্য লাভের পথ প্রশস্ত করে। আর সকল সুস্থ মানুষের মতোই অনেক ক্যান্সার রোগীরাও রোজা রাখার তীব্র আকাঙ্ক্ষা লালন করেন। তবে মনে রাখতে হবে, ইসলামে অসুস্থ ব্যক্তির জন্য বিশেষ শিথিলতা ও বিকল্প বিধান রয়েছে।  

রোজা রাখা বা না রাখার সিদ্ধান্ত: চিকিৎসক ও আলেমের সমন্বয়

ক্যান্সার রোগীদের রোজা রাখার বিষয়টি কেবল আবেগ দিয়ে বিবেচনা করলে চলবে না। পবিত্র কোরআনে অসুস্থ ব্যক্তিদের জন্য রোজা পরে আদায় করার বা ফিদিয়া দেওয়ার বিধান রয়েছে। কোনো রোগী যদি রোজা রাখতে চান, তবে প্রথমে তার চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ বা চেকাপ করে নিবেন। এরপর শারীরিক ঝুঁকির বিষয়টি জেনে কোনো বিজ্ঞ আলেমের সাথে কথা বলে তিনি ধর্মীয় মাসআলা জেনে নিতে পারেন। জীবন ঝুঁকিতে ফেলে রোজা রাখা ইসলামের শিক্ষা নয়। 

কারা রোজা রাখতে পারবেন বা বিরত থাকবেন? 

সাধারণত যাদের ক্যান্সার বর্তমানে নিয়ন্ত্রণে আছে, যারা দীর্ঘমেয়াদী হরমোন থেরাপি বা ওরাল ওষুধ নিচ্ছেন এবং শারীরিক সক্ষমতা ভালো, তারা চিকিৎসকের অনুমতি সাপেক্ষে রোজা রাখতে পারেন। তবে নিয়মিত কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি বা তীব্র জটিলতা থাকলে রোজা না রাখাই শ্রেয়। 

•    কেমোথেরাপি গ্রহণকারী রোগীদের জন্য: কেমোথেরাপির ওষুধ শরীরের কোষের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে। এর ফলে বমি ভাব, মুখ শুকিয়ে যাওয়া, জ্বর এবং পানিশূন্যতা দেখা দেয়। কেমো সেশনের অন্তত ১ সপ্তাহ পর শারীরিক অবস্থা বুঝে সিদ্ধান্ত নিন। 

•    রেডিওথেরাপি গ্রহণকারী রোগীদের জন্য: রেডিওথেরাপি (বিশেষ করে মুখ, গলা বা পেটের অংশে) দিলে ওই স্থানের চামড়া ও ভেতরের মিউকাস মেমব্রেন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এক্ষেত্রে অল্প করে বাড়বার নরম ও ঠাণ্ডা খাবার বেছে নিতে হয়, তাই রোযা রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে পরে। 

ইফতার ও সেহরির বিশেষ খাদ্যতালিকা

ক্যান্সার রোগীদের শরীরের শক্তি ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অটুট রাখতে নিচের খাবারগুলো বিশেষভাবে যোগ করুন:

•    ডিম ও প্রোটিন: শরীরে টিস্যু পুনর্গঠন ও দুর্বলতা কাটাতে প্রতিদিন অন্তত একটি সেদ্ধ ডিম খান। এছাড়া মাছ বা মুরগির মাংস প্রোটিনের ভালো উৎস।

•    বেল ও পেঁপে: দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার ফলে কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা হতে পারে। ইফতারে বেলের শরবত বা পাকা পেঁপে খেলে হজম প্রক্রিয়া সহজ হয় এবং পেট পরিষ্কার থাকে।

•    লেবু ও সাইট্রাস ফল: ভিটামিন-সি এর জন্য লেবুর শরবত অত্যন্ত কার্যকর। এটি ক্লান্তি দূর করে এবং রুচি বাড়াতে সাহায্য করে। তবে যাদের মুখে ঘা আছে, তারা অতিরিক্ত টক জাতীয় ফল এড়িয়ে চলবেন।

•    খেজুর ও শসা: ইফতারে দ্রুত শক্তির জন্য খেজুর এবং শরীরের পানির ভারসাম্য ধরে রাখতে ও শরীর ঠাণ্ডা রাখতে শসা খুব ভালো কাজ করে।

•    কলা: এটি পটাশিয়ামের একটি চমৎকার উৎস এবং তাৎক্ষণিক শক্তি জোগাতে সাহায্য করে। এছাড়া কলা হজম করা সহজ এবং এটি পাকস্থলীর জ্বালাপোড়া কমাতে ও শরীরে ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্য বজায় রাখতে ভূমিকা রাখে। 

•    তরল খাবার: ভাজাপোড়া ও অতিরিক্ত চিনিযুক্ত পানীয়র বদলে ডাবের পানি, দইয়ের শরবত বা ঘরে তৈরি ফলের রস পান করুন। 

সেহরি ও রাতের খাবার

সেহরিতে লাল চালের ভাত, রুটি, ওটস, মাছ, মুরগির মাংস, ডাল ও সবজি রাখুন যা দীর্ঘ সময় শরীরে শক্তি যোগাবে। 
যে খাবারগুলো পরিহার করা আবশ্যক

ক্যান্সার রোগীদের পরিপাকতন্ত্র ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অত্যন্ত সংবেদনশীল থাকে, তাই রমজানে খাদ্যাভ্যাসে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন: 

•    বাইরের খোলা খাবার: রমজানে বাইরে হরেক রকম ইফতারি বিক্রি হয় যা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি হতে পারে। এই ধরনের খোলা এবং বাসি খাবার সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়, যা ক্যান্সার রোগীর জন্য বিপজ্জনক।

•    ভাজাপোড়া ও মশলাযুক্ত খাবার: অতিরিক্ত তেল ও মশলাযুক্ত খাবার (যেমন: পিঁয়াজু, বেগুনি, চপ বা বিরয়ানি) একেবারেই পরিহার করুন। 

•    কৃত্রিম পানীয়: অতিরিক্ত চিনিযুক্ত প্যাকেটজাত শরবত বা কার্বোনেটেড বেভারেজ (সফট ড্রিংকস) এড়িয়ে চলুন। 

•    অতিরিক্ত চা ও কফি: সেহরি বা ইফতারে চা-কফি পান না করাই ভালো, এগুলো শরীরকে দ্রুত পানিশূন্য (Dehydrated) করে ফেলে।

কখন রোজা ভেঙে ফেলতে হবে?

রোজা রাখা অবস্থায় যদি আপনার শারীরিক অবস্থার অস্বাভাবিক অবনতি ঘটে, তবে জোর করে রোজা পূর্ণ করা জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। বিশেষ করে যদি আপনার তীব্র মাথা ঘোরা বা জ্ঞান হারানোর মতো অবস্থা তৈরি হয়, বারবার বমি হতে থাকে কিংবা শরীর প্রচণ্ড নিস্তেজ হয়ে রক্তচাপ অস্বাভাবিক কমে যায়, তবে কালক্ষেপণ না করে রোজা ভেঙে ফেলুন। এছাড়া মুখ ও জিহ্বা অতিরিক্ত শুকিয়ে যাওয়া বা অসহ্য শ্বাসকষ্ট শুরু হওয়া তীব্র সংকটের লক্ষণ। তাই এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত রোজা ভেঙে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন। 

ক্যান্সারের সাথে লড়াই করা প্রতিটি রোগীই একেকজন অকুতোভয় যোদ্ধা। আপনার শারীরিক সক্ষমতা বিবেচনা করে সঠিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে পালন করুন এই পবিত্র মাসের ইবাদত। মহান আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করি—আপনার ধৈর্য ও আত্মত্যাগ কবুল হোক এবং সুস্থতায় কাটুক আপনার আগামীর প্রতিটি দিন। মাহে রমজানের পবিত্র আলোয় আপনার জীবন আনন্দময় ও রোগমুক্ত হোক। আমিন।

লেখক : আবাসিক চিকিৎসক, বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটি হাসপাতাল এন্ড অয়েলফেয়ার হোম।
প্রতিষ্ঠাতা, ক্যান্সার এওয়ারনেস ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here